shershanews24.com
বড় পুকুরিয়া কয়লাখনি: চীনা প্রতিষ্ঠানকে ১৮০ কোটি টাকা অবৈধভাবে পরিশোধ
রবিবার, ০৯ জুন ২০১৯ ০৭:২৯ অপরাহ্ন
shershanews24.com

shershanews24.com

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: লাগামহীন দুর্নীতি, পছন্দের কোম্পানিকে কাজ পাইয়ে দেয়া, ভুয়া বিলের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ, দেশীয় যন্ত্রাংশ ক্রয় করে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নামে ভাউচার তৈরিসহ নানা অনিয়মে বিশাল অংকের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে যাচ্ছে দেশের সবচেয়ে বড় কয়লার খনি দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানি। চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এক্সএমসি-সিএমসি কনসোর্টিয়ামকে শত কোটি টাকার অবৈধ আর্থিক সুবিধা প্রদান করছে বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানিতে গড়ে ওঠা একটি দুর্নীতিবাজ চক্র। খোদ খনি ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ফজলুর রহমান এবং  মাইনিং, সারফেজ ও পারসেজ-এর জিএম সাইফুল ইসলামের যোগসাজশে গড়ে ওঠা চক্রটি চীনা প্রতিষ্ঠানের অনুকুলে বিভিন্ন ধরনের বিল পাশ করিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। তাদের সহায়তায় চীনা প্রতিষ্ঠানটি কয়লা উৎপাদন সাময়িক বন্ধ করে ব্ল্যাকমেইলিংয়ের মাধ্যমে মোটা অংকের বিল পাশ করিয়ে নিচ্ছে। অনেক সময় কাজ না করেও চুক্তি বর্হিভূত বিল আদায় করে নিচ্ছে চীনা কনসোর্টিয়ামটি। ফলে খনি থেকে কয়লা উৎপাদন যেমন ব্যাহত হচ্ছে তেমনি ব্যাহত হচ্ছে বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন কার্যক্রম। কারণ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জ¦ালানি হিসেবে বড়পুকুরিয়ার কয়লা ব্যবহার করা হয়। ফলে সরকারকে হাজার কোটি টাকার লোকসান গুণতে হচ্ছে। কয়লা খনিতে ইচ্ছাকৃত উৎপাদন বন্ধ রাখা ও প্রকল্প এলাকার উন্নয়ন কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ না করায় এক্সএমসি-সিএমসি কনসোর্টিয়ামের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ (এলডি) পাওয়ার কথা বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানির। কিন্তু ক্ষতিপুরণ আদায় না করে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা উল্টো ওই চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে একের পর এক অবৈধ আর্থিক সুযোগ-সুবিধা  দিচ্ছে। অসাধু কর্মকর্তাদের সহায়তায় পরিচালনা পর্ষদে জোর খাটিয়ে ইচ্ছামত বিল পাশ করিয়ে নিচ্ছে। এতে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি কোম্পানি আর্থিকসহ নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
চীনা প্রতিষ্ঠানকে অবৈধ আর্থিক সুবিধা পাইয়ে দেয়া ও ভূয়া বিল পরিশোধ সম্পর্কিত বিষয়ে বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে লিখিত অভিযোগ এসেছে। অভিযোগ পাওয়ার কথা জানিয়ে সংসদীয় কমিটির সদস্য শামসুর রহমান শরীফ বলেছেন, ‘অভিযোগ নিয়ে কমিটির পরবর্তী বৈঠকে আলোচনা হবে। সেখান থেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হবে’। অভিযোগে বলা হয়েছে, সিএমসি কনসোর্টিয়ামের সাথে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি এলাকার উন্নয়ন কাজ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে। অন্যথায় তাদের ক্ষতিপূরণ (এলডি) দিতে হবে। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোম্পানির অভ্যন্তরীণ সড়ক নির্মাণ করে নি। কিন্তু এমডি ফজলুর রহমান তাদেরকে সড়ক নির্মাণের জন্য অবৈধভাবে বিল পাইয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করেন। শুধু তাই নয়, চীনা প্রতিষ্ঠানটিকে এই বিলসহ যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য অতিরিক্ত বিল এবং স্থানীয় ও বৈদেশিক মালামাল ক্রয়ের ক্ষেত্রে চুক্তি বর্হিভূত বিলসহ প্রায় ৫০ কোটি টাকা দেয়া হয়। বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানির পরপর চারটি পরিচালনা পর্ষদের সভায় এসব বিষয়ে আপত্তি উঠলেও ওই চীনা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সাফাই গেয়ে নানা কৌশলে পর্ষদ সদস্যদের ম্যানেজ করে ওই বিল পাস করিয়ে নেয়া হয়। বিল পাস করার পূর্ব-কৌশল হিসেবে চীনা কোম্পানিটি অসাধু কর্মকর্তাদের সহযোগে প্রায় সপ্তাহখানেক কয়লা উৎপাদন বন্ধ রাখে। এভাবে বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানিকে জিম্মি করে কয়েক দফায় এক্সএমসি-সিএমসি কনসোর্টিয়াম প্রায় ১৮০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এক্ষেত্রে খনির এমডি ফজলুর রহমান অবৈধ বিল পাওয়ার ক্ষেত্রে চীনা প্রতিষ্ঠানকে সহযোগিতা করছেন বলে জানা যায়। চীনা কনসোর্টিয়ামের সাথে বড়পুকুরিয়া কয়লা কোম্পানির চুক্তি অনুযায়ী কয়লায় আদ্রতার (পানি) পরিমাণ ৫ দশমিক এক শতাংশ পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য। এর বেশি থাকলে বাড়তি পানির দাম বাদ দিয়ে ঠিকাদারকে কয়লার দাম পরিশোধ করার কথা। কিন্তু সরোজমিনে দেখা যায়, কয়লাতে পানির পরিমাণ চুক্তিতে নির্ধারিত অপেক্ষা অনেক বেশি। অথচ বাড়তি পানির দাম বাদ না দিয়ে কয়লার সঙ্গে পানির একই মূল্য পরিশোধ করা হচ্ছে। এই অপকর্মের সাথে খনির অসাধু কর্মকর্তারা সরাসরি জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে। তারা মোটা অংকের উৎকোচের বিনিময়ে চীনা কোম্পানিকে ওই বিলগুলো পাইয়ে দেন। এতে বড়পুকুরিয়া কোম্পানি আর্থিকভাবে বড় ধরনের ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে।
গত বছর আগস্টে বড়পুকুরিয়া কয়লা কোম্পানিতে ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে চলতি দায়িত্ব নিয়েই ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন ফজলুর রহমান। তার ব্যাপক লুটপাটের কারণে দেশের বৃহত্তম এ কয়লা খনিটি অবৈধ টাকা কামানোর খনিতে পরিণত হয়েছে। জানা যায়, নিয়োগ লাভের এক বছরের মাথায় তিনি বিপুল অর্থের মালিক বনে গেছেন। খনিতে প্রায় ১৪৭জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। তাদের প্রফিট বোনাস আটকে রেখে কয়লা খনি কোম্পানির স্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারী সকলের কাছ থেকে বাধ্যতামূলক মাথাপিছু ৪০ হাজার টাকা করে প্রায় ৫৮ লাখ টাকা আদায় করেন তিনি। বিষয়টি গণমাধ্যমে ফাঁস হলে তিনি বেজায় ক্ষুব্ধ হন। এর জেরে সন্দেহবশত বেশকিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বিনা কারণে বদলি ও শোকজ করেন তিনি। গণমাধ্যমকে ভবিষ্যতে আর কোনো তথ্য না দিতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চিঠিও দেন। এসব ঘটনা তদন্তে পেট্রোবাংলা একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কিন্তু এ পর্যন্ত কমিটির কাছ থেকে কোনো তদন্ত প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখেনি। 
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায় ফজলুর রহমান ওই তদন্ত কমিটির প্রধানের সাথে চীন সফরে গিয়েছেন। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ওঠার পরেও ফজলুর রহমানের বিরুদ্ধে কোনো প্রকারের ব্যবস্থা নিতে পারছে না পেট্রোবাংলা। এর পেছনে বড়পুকুরিয়া কোম্পানির দুই কর্মকর্তার হাত রয়েছে বলে জানা যায়। তারা হলেন- জেনারেল ম্যানেজার (প্রশাসন) সাইফুল ইসলাম দিপু ও ম্যানেজার (মাইনিং) মোশাররফ হোসেন। সাইফুল ইসলাম পেট্রোবাংলার এক পরিচালকের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হওয়ায় দুর্নীতির তদন্তে কোন প্রকার অগ্রগতি হয়নি। বরং তদন্ত কার্যক্রমকে বিভিন্নভাবে বাধাগ্রস্থ করেছে। সাইফুল ইসলামকে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা দিয়ে তার মধ্যস্থতায় এমডি ফজলুর রহমান পেট্রোবাংলার তদন্ত কমিটিকে ম্যানেজ করছেন। তাদের দাপটে তদন্ত কমিটির কাছে কেউ মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না। যেসকল কর্মকর্তা-কর্মচারী তাদের দুর্নীতি নিয়ে মুখ খুলতে চান, তাদেরকে নানান ভয়-ভীতি দেখানোসহ হুমকি-ধমকি দিয়ে দমিয়ে রাখা হয়। আর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক পদক্ষেপ নেয়ার বিষয়ে নানা পরামর্শ দেয়ার কাজটি করে ম্যানেজার মোশাররফ হোসেন। তিনি এই কাজগুলো করে এমডি’র আস্থাভাজন হয়ে অবৈধভাবে কোম্পানির গাড়ি ব্যবহারসহ নানাভাবে আর্থিক সুযোগ-সুবিধা নিচ্ছেন। 
অন্যদিকে খনির মাইনিং,সারফেজ ও পারসেস বিভাগের জিএম সাইফুল ইসলাম তার মনোনীত ঠিকাদারকে দিয়ে কোটেশনের মাধ্যমে কাজ পাইয়ে দিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তিনি খনি এলাকার স্থানীয় নির্দিষ্ট দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স এন এফ ট্রেডার্স ও এম এস ট্রেডার্সকে টেন্ডার স্পেসিফিকেশনে কারসাজির মাধ্যমে খনি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কাজ পাইয়ে দেন। যার বিনিময়ে মোটা অংকের ঘুষ নেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক ঠিকাদার বলেন, কাজ না করেও বিল তুলে তা নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করেন জি এম সাইফুল ইসলামসহ উর্ধ্বতন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা। তাকে কোম্পানি সচিব হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্বও দেয়া হয়েছে। তিনি একাই নিয়ম বর্হিভূতভাবে কোম্পানির চারটি গাড়ি ব্যবহার করছেন। বেশির ভাগ সময় ঢাকায় অবস্থান করে তিনি বাড়তি টিএ-ডিএ নিচ্ছেন। এছাড়াও দীঘিপাড়া প্রকল্পের পিডি জাফর সাদিকও এমডির কাছের লোক হিসেবে পরিচিত। চাকরি জীবনের বেশির ভাগ সময় তিনি মাইনিং বিভাগের অধীনে কয়লা উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনায় ছিলেন। কর্মরত থাকাকালীন তিনি অন্য আরও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে ব্যাপক হারে কয়লা লুটপাট করে বিভিন্ন কোম্পানির কাছে বিক্রি করেছেন। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। তার দুর্নীতির বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ প্রসঙ্গে বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুর রহমান বলেন, ‘যারা এ অভিযোগ দিয়েছে তারা ইতিপূর্বে এখানে বড় বড় দুর্নীতি করে গেছে। তাই তাদের অভিযোগ সঠিক নয়। সাবেক ডিজি আমার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ করছেন। এইসব অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে জানতে প্রয়োজনে আপনারা তদন্ত করেন।’ 
এর আগে গতবছর হাজার হাজার টন কয়লা চুরির কারণে খনি থেকে কয়লা উত্তোলন প্রায় তিন মাস বন্ধ ছিল। ফলে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল বড় পুকরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানির কয়লা দিয়ে চলা ৫২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রটি। এ ঘটনায় খনির তৎকালীন চার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাসহ ১৯ কর্মকর্তার নামে দুর্নীতি দমন আইনে মামলা করেছিল খনি কর্তৃপক্ষ। তাদের মধ্যে কয়েকজন কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করে নতুনভাবে বিভিন্ন পদে নিয়োগ দেয়া হয়।  কিন্তু তাতেও তেমন একটা লাভ হয়নি। লুটপাট চলছেই পুরোদমে। বর্তমানে চীনা কোম্পানিসহ স্থানীয় কয়েকটি কোম্পানিকে অবৈধভাবে কাজ পাইয়ে দিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি গ্রুপ। অনেক সময় কাজ না করেও ভূয়া বিলের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ করছে তারা। কয়লা খনির একটি দুর্নীতিবাজ চক্র দেশীয় যন্ত্রাংশ ক্রয় করে বিদেশি যন্ত্রাংশের বিল ভাউচার দেখিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে কোটি কোটি টাকা লুটপাট করে আসছে। তারা বাড়ি-গাড়িসহ বিপুল অর্থের মালিক হয়েছেন। নামে বেনামে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। কিন্তু এভাবে ব্যাপক দুর্নীতি করেও পার পেয়ে যাচ্ছেন বড়পুকুরিয়া কোম্পানির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক খনি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বলেছেন, এভাবে চলতে থাকলে বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবে বড়পুকুরিয়া খনি কোম্পানি। তাই খনি কোম্পানিকে লোকসান ও আসন্ন ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষায় দুর্নীতিবাজদের সম্পদের হিসাব নেওয়াসহ সকল দুর্নীতির সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা আবশ্যক।   
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ২০ মে ২০১৯ প্রকাশিত)