বৃহস্পতিবার, ২২-আগস্ট ২০১৯, ০৬:৩২ অপরাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • স্বাস্থ্য অধিদফতরের উন্নয়ন খাতের কর্মচারী নিয়মিতকরণে গুরুতর অনিয়ম

স্বাস্থ্য অধিদফতরের উন্নয়ন খাতের কর্মচারী নিয়মিতকরণে গুরুতর অনিয়ম

shershanews24.com

প্রকাশ : ০২ আগস্ট, ২০১৯ ০৮:৩১ অপরাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: স্বাস্থ্য অধিদফতরের উন্নয়ন প্রকল্প থেকে রাজস্ব খাতে স্থানান্তরিত পদের কর্মচারীর চাকরি নিয়মিতকরণে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির ঘটনা ফাঁস হয়েছে। এতে ঘুষ লেনদেনেরও অভিযোগ উঠেছে। যদিও উন্নয়ন খাতের কর্মচারীদের চাকরি নিয়মিতকরণ ভূতাপেক্ষভাবে কার্যকর করার বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের (সাবেক সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের) ২০১০ সালে জারি করা এক পরিপত্রে স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদফতর এটি মানেনি। স্বাস্থ্য অধিদফতরের একজন কর্মচারীর চাকরি নিয়মিতকরণের ক্ষেত্রে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এই আদেশ চরমভাবে লঙ্ঘন করা হয়েছে। এমনকি এতে বিভাগীয় নির্বাচন কমিটির সিদ্ধান্তকেও পাশ কাটানো হয়েছে। 
জানা গেছে, বিভাগীয় নির্বাচন কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে ২০১০ সালে এই কর্মচারীর চাকরি নিয়মিতকরণ করা হয়। কিন্তু পরে ২০১২ সালে স্বাস্থ্য অধিদফতর অত্যন্ত গোপনে এক সংশোধনী আদেশের মাধ্যমে তার চাকরি ভূতাপেক্ষভাবে কার্যকর করে, যা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পরিপত্রের স্পষ্ট লঙ্ঘন। এমনকি এই সংশোধনী আদেশ জারির ক্ষেত্রে বিভাগীয় কমিটির সুপারিশ বা অনুমতিও নেয়া হয়নি। স্বাস্থ্য অধিদফতরের তৎকালীন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এই অপকর্মের সঙ্গে সরাসরি জড়িত এবং এতে মোটা অংকের অর্থের লেনদেন হয়েছে। জানা গেছে, গুরুতর এই দুর্নীতির ঘটনা এতোদিন গোপন থাকলেও সম্প্রতি ফাঁস হয়ে যায়। 
সূত্রে জানা যায়, বিভাগীয় নির্বাচন কমিটির সুপারিশের প্রেক্ষিতে ২০১০ সালের ১৪ জানুয়ারি স্বাস্থ্য অধিদফতরের তৎকালীন পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মো. আবুল হাসনাত স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে উন্নয়ন খাতের ৩য় শ্রেণির কর্মচারী একেএম আজিজুল হকের চাকরি নিয়মিতকরণ করা হয়। উক্ত অফিস আদেশে বলা হয়, স্বাস্থ্য অধিদফতরের “বিভাগীয় নির্বাচন কমিটি”র সুপারিশক্রমে “থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সার্বিক কর্মকা-ের উন্নয়ন (১ম পর্ব-৫০)টি” শীর্ষক সমাপ্ত প্রকল্পের রাজস্ব খাতে স্থানান্তরিত পদের বিপরীতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক অস্থায়ীভাবে পদায়নকৃত ০১ (এক) জন ৩য় শ্রেণির কর্মচারীকে তাঁর নামের পার্শ্বে বর্ণিত পদে ও বেতন স্কেলে শর্তসাপেক্ষে চাকরি নিয়মিতকরণ করা হলো। এই আদেশে স্টেনোগ্রাফার একেএম আজিজুল হকের চাকরি নিয়মিতকরণ করে তাকে স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) শাখায় পদায়ন করা হয়।
কিন্তু এরপর একেএম আজিজুল হকের চাকরি নিয়মিতকরণের বিষয়ে ২০১২ সালের ২২ মে স্বাস্থ্য অধিদফতরের তৎকালীন পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মতিউদ্দিন আহমদ কর্তৃক এক “সংশোধিত অফিস আদেশ” জারি করা হয়। এই অফিস আদেশে একেএম আজিজুল হকের চাকরি নিয়মিতকরণ ভূতাপেক্ষভাবে ১ জুলাই, ১৯৯৯ থেকে কার্যকরের কথা উল্লেখ করা হয়। সংশোধিত এই আদেশে বলা হয়, “স্বাস্থ্য অধিদফতরের ‘বিভাগীয় নির্বাচন কমিটি’র সুপারিশক্রমে ‘থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সার্বিক কর্মকা-ের উন্নয়ন (১ম পর্ব-৫০)টি’ শীর্ষক সমাপ্ত প্রকল্পের রাজস্ব খাতে স্থানান্তরিত পদের বিপরীতে কর্মরত স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক অস্থায়ীভাবে পদায়নকৃত নি¤œবর্ণিত কর্মচারীকে তাঁর নামের পার্শ্বে বর্ণিত পদে ও বেতন স্কেলে শর্তসাপেক্ষে স্বাস্থ্য অধিদফতরের স্মারক নং- স্বা:অধি:/প্রশা-৪/নিয়োগ-পদোন্নতি/৩য়-৪র্থ/০১/১০৩৯, তারিখ: ১৪/০১/২০১০ ইং মোতাবেক নিয়মিতকরণ করা হয়েছিল। এতদ্বারা আদেশটি আংশিক সংশোধন করে শর্তাবলী অপরিবর্তিত রেখে পদটি রাজস্বখাতে স্থানান্তরের ০১/০৭/১৯৯৯ ইং তারিখ হতে তাঁর চাকরি নিয়মিতকরণ করা হলো।”
অথচ এর আগে ২০১০ সালের ১১ অক্টোবর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের (সাবেক সংস্থাপন মন্ত্রণালয়) তৎকালীন সচিব ইকবাল মাহমুদ কর্তৃক স্বাক্ষরিত এক পরিপত্রে এ ধরনের ভূতাপেক্ষভাবে নিয়মতকরণের কার্যক্রমের বিষয়ে কঠোরভাবে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। “উন্নয়ন প্রকল্প হতে রাজস্ব বাজেটে স্থানান্তরিত পদের পদধারীদের নিয়মিতকরণ ও জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ বিধিমালা, ২০০৫ এর অধীনে নিয়মিত কর্মচারীদের নিয়মিতকরণের তারিখ স্পষ্টীকরণ” শিরোনামে ওই পরিপত্রটি জারি করা হয়। এতে বলা হয়, শুধুমাত্র যারা ইতিমধ্যে অবসরগ্রহণ করেছে, অবসর-উত্তর ছুটিতে আছে অথবা মৃত্যুবরণ করেছে- এরা ছাড়া উন্নয়ন খাত থেকে রাজস্বখাতে স্থানান্তরিত অন্য কোনো কর্মচারীর চাকরি ভূতাপেক্ষভাবে নিয়মিতকরণ করা যাবে না। 
কিন্তু ২২ মে, ২০১২ স্বাস্থ্য অধিদফতরের তৎকালীন পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মতিউদ্দিন আহমদসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা স্টেনোগ্রাফার একেএম আজিজুল হকের চাকরি ভূতাপেক্ষভাবে রাজস্বখাতে স্থানান্তর সংক্রান্ত “সংশোধিত অফিস আদেশ” জারির ক্ষেত্রে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এই পরিপত্র বা কোন বিধিবিধানের ধার ধারেন নি। এছাড়াও উক্ত বিষয়ে নতুন করে সিদ্ধান্ত বা আদেশ প্রদানের পূর্বে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় অথবা বিভাগীয় নির্বাচন কমিটির পরামর্শ, সিদ্ধান্ত ও সুপারিশ গ্রহণ করেননি তারা। অথচ সরকারি যে কোনো কর্মকা-ের ক্ষেত্রে সাধারণ নিয়ম হলো, কোনো বিষয়ে কমিটি বা ঊর্ধ্বতন কোনো কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে একবার সিদ্ধান্ত নেয়া হলে, পরবর্তীতে ওই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন বা সংশোধনের প্রয়োজন হলে সেই কমিটি বা কর্তৃপক্ষের মতামত নেয়া অপরিহার্য। একেএম আজিজুল হকের চাকরি নিয়মিতকরণ ভূতাপেক্ষভাবে কার্যকরের ক্ষেত্রে সেই নিয়মকানুনের চরম লঙ্ঘন করা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের তৎকালীন পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মতিউদ্দিন আহমদসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ঘুষ লেনদেনের মাধ্যমে অত্যন্ত গোপনে এই গুরুতর অপকর্মটি করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি এ ঘটনা ফাঁস হলে বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক তোলপাড় হয়।  
উল্লেখ্য, স্টেনোগ্রাফার আজিজুল হককে প্রথমে অতিরিক্তি মহাপরিচালক (উন্নয়ন ও পরিকল্পনা) শাখায় পদায়ন করা হলেও পরবর্তীতে ২০১২ সালের ২২মে’র সংশোধিত অফিস আদেশটিতে তাকে অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) এর শাখায় পদায়ন করা হয়। তিনি বর্তমানে অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) এর পিএ পদে আছেন। এ দফতরে বসে অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) এর নাম ব্যবহার করে স্বাস্থ্যখাতের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ডাক্তারদের ওপর নানা রকমের অবৈধ প্রভাব খাটানো এবং তাদের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নেয়ার অভিযোগও রয়েছে আজিজুল হকের বিরুদ্ধে। 
চাকরি অবৈধভাবে নিয়মিতকরণসহ এসব বিষয়ে শীর্ষকাগজের পক্ষ থেকে আজিজুল হকের মন্তব্য জানতে চাওয়া হলে তিনি প্রথমে চ্যালেঞ্জ করেন, এ ধরনের কোনো আদেশের কপি শীর্ষকাগজ প্রতিবেদকের কাছে আছে কিনা জানতে চান। পরে তিনি বলেন, এ আদেশ আমি তো করিনি। অধিদফতর করেছে। 
আপনাকে অবৈধ সুবিধা দেয়ার জন্য অধিদফতর এই সংশোধনী আদেশ জারি করেছে, এমন প্রশ্নের জবাবে আজিজুল হক বলেন, অধিদফতর কেন করেছে সেটা আমি জানি না।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ৮ জুলাই ২০১৯ প্রকাশিত)