বৃহস্পতিবার, ২০-জুন ২০১৯, ১১:৪২ অপরাহ্ন

রাজনীতিতে গুমোট

Sheershakagoj24.com

প্রকাশ : ৩১ মে, ২০১৯ ১১:৪০ পূর্বাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: দেশের রাজনীতিতে এক গুমোট পরিবেশ বিরাজ করছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, ‘আজকে দেশে যে রাজনৈতিক অবস্থা বিরাজ করছে, তার চেয়ে খারাপ অবস্থা অতীত ইতিহাসে ছিল কি না আমার জানা নেই।’ বিএনপির কর্মকান্ড একেবারে নেই বললেই চলে। আন্দোলনের কর্মসূচির জন্য দলটির শুভাকাক্সক্ষী এবং মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের প্রচন্ড চাপের পরেও বিএনপির নীতিনির্ধারণী মহল এ ব্যাপারে একেবারেই নিশ্চুপ। এদিকে বিএনপি জোটের শরিক দল জামায়াতে ইসলামীরও কোনো তৎপরতা নেই। আন্দোলন-সংগ্রামে তো নেইই, তার উপর সাম্প্রতিক সময়গুলোতে জাতীয় সংসদ ও নির্বাচন প্রশ্নে একের পর এক আপোষকামীতার যেসব সিদ্ধান্ত বিএনপি নিচ্ছে তাতে দলের ভেতরের-বাইরের সবাই একবাক্যে অবাক হচ্ছে। দীর্ঘদিনের নীতি-আদর্শ পরিপন্থী এমন সিদ্ধান্ত কেউ কখনো কল্পনা করেছে বলেও মনে হয় না। তারপরেও ক্ষমতাসীন দল যেন স্বস্তিতে নেই। বলা যায়, এক ধরনের অস্বস্তি বিরাজ করছে ক্ষমতাসীনদের মধ্যেও। 
আওয়ামী লীগের সবাই; এমনকি রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও অনেকে একবাক্যে বলে থাকেন, সব কিছুই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কারিশমা। ভারত এবং চীন দুটি চরম পরস্পর বিদ্বেষী রাষ্ট্রকে একইসঙ্গে হাতের মধ্যে রেখে বিগত এক দশকেরও বেশি সময় দেশ পরিচালনা করে আসছেন। রাজনৈতিক কারিশমা না থাকলে এটি সম্ভব নয়। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সেটা আর হয়ে উঠছে না। উভয় দেশই এখন নতুন করে হিসাব নিকাশ চাইছে।  যা মেটানো একরকমের কঠিন হয়ে পড়েছে। এদিকে দেশের অর্থনীতির অবস্থা একেবারে লেজেগোবরে। বিশেষ করে ব্যাংকগুলোতে অর্থ সংকট, শেয়ার বাজারে অস্থিরতা গোটা সরকারকে ভাবিয়ে তুলেছে। বলা যায়, একরকম স্থবির করে ফেলেছে গোটা অর্থনীতিকে।
সর্বশেষ কয়েকটি ঘটনায় দেশের প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দল বিএনপির তৎপরতা অনেকটা রহস্যজনক ঠেকছে অনেকের কাছে। বিএনপি জাতীয় সংসদে যাবে না এই সিদ্ধান্তে অনড় ছিল। দলটির দীর্ঘদিনের নীতি আদর্শের সঙ্গে সেটিই ছিল সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু হঠাৎ করে শেষ মুহূর্তে সংসদে যোগ দেওয়ার ঘোষণা দেয়া হলো। সবাইকে অবাক করে পরে আবার দেখা গেলো বগুড়া-৬ আসন থেকে নির্বাচিত হয়েও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। শপথ না নেয়ার ফলে আসনটিতে উপ-নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ওই আসনে বিএনপির প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিয়ে দুদিন আগেও অনিশ্চয়তা ছিলো। কিন্তু হঠাৎ করে বিএনপি ফখরুলের সেই আসনেই আবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দিয়েছে। সংরক্ষিত নারী আসনেও নাম পাঠাবে।  এদিকে ২০ দলীয় জোটের অন্যতম নেতা কর্নেল অলি আহমদ খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলনের বিষয়ে তৎপর হয়ে উঠেছেন। এই ২০ দলের দায়িত্ব নেয়ার জন্য তিনি প্রস্তুত বলে ঘোষণা দিয়েছেন। এমনকি খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য তিনি জীবন উৎসর্গ করতেও রাজি এমন কথাও বলেছেন। তবে বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতারা এখনো এ বিষয়ে নিশ্চুপ রয়েছেন। শোনা যাচ্ছে, খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য বিএনপি একটি রাজনৈতিক মঞ্চ করতে যাচ্ছে। কর্নেল (অব,) অলি আহমদকে সেই মুক্তি আন্দোলনের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। বিএনপির বাইরে থাকা কর্নেল অলিকে হঠাৎ করে কেন এই দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে তা নিয়েও রহস্য রয়েছে। আবার কর্নেল অলি এক্ষেত্রে জামায়াতকেও পাশে রাখছেন। সব মিলিয়ে রাজনীতিতে একটি ঘোলাটে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। 
বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের রাজনীতির ভবিষ্যত একটি অচলাবস্থার দিকে ধাবিত হচ্ছে। বিশেষ করে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এই অবস্থাটি আরো ঘনীভূত হয়েছে। রাশেদ খান মেননের ভাষায়, রাজনীতিকে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে।  দীর্ঘদিন ধরে দেশে একটি সংসদ বর্তমান রয়েছে যেখানে কার্যত কোনো বিরোধী দল নেই। সরকারের কর্মকা-ের গঠনমূলক সমালোচনা সেখানে ব্যাপকভাবে অনুপস্থিত। আগামী ১১ জুন সংসদের বাজেট অধিবেশন ডাকা হয়েছে।  সংসদের এই অধিবেশনে ১৩ জুন ২০১৯-২০২০ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করা হবে। আগামী ৩০ জুনের মধ্যে এ বাজেট পাস হবে। এবারের এই অধিবেশনে দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি থাকবে। নিয়মতান্ত্রিক বিরোধী দলও থাকবে। সাধারণত বাজেট আলোচনায় সব দল অংশ নিয়ে থাকে। কিন্তু এতকিছুর পরেও সংসদ তার পুরনো চেনা চেহারা ফিরে পাবে না। সকল দল সংসদে থাকবে, আবার ঠিক থাকাও হবে না। রাজনীতিতে এই যে অস্বাভাবিকতা বিরাজমান, তার রেশ কাটবে না, চলমান থাকবে। এমন পরিস্থিতিতে জনগণ রাজনীতির প্রতি আস্থা হারাচ্ছে। এর মধ্যেই বড় দুই দলের ভবিষ্যত রাজনৈতিক কাঠামো নিয়ে দুশ্চিন্তা শুরু হয়েছে। জাতীয় রাজনীতি অনেকটা স্থবির হয়ে পড়েছে। বড় বড় রাজনৈতিক জোটগুলোও ক্রমশ দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। খোদ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট বা ১৪ দলই গতিশীলতা হারাচ্ছে। জোটটির অন্যতম শরিক দল বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এবং জাসদের হাসানুল হক ইনুরা মন্ত্রিসভায় না থাকায় একটি অন্যরকম পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। আবার ১৪ দল কাগজে কলমে থাকলেও তাও গতিশীল নেই। নতুন মন্ত্রিসভায় স্থান না পেয়ে ইতিমধ্যে সরকারের নানা সমালোচনাও শুরু করে দিয়েছেন হাসানুল হক ইনু ও রাশেদ খান মেননের মতো সরকারের মধ্যের লোকেরা। ঋণ খেলাপি সংক্রান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের সদ্য ঘোষিত প্রজ্ঞাপনের সমালোচনা করে ১৭ মে নারায়ণগঞ্জে দলের এক অনুষ্ঠানে মেনন বলছেন, অর্থমন্ত্রীর আনুকূল্যে বড় বড় ঋণ খেলাপিরা এবার দশ বছরের জন্য হালাল হয়ে গেল। তারপরও আরও ছয়মাসও তারা কিস্তি না দিয়ে থাকতে পারবে। ওয়ার্কার্স পার্টি এ বিষয়গুলো সংসদে তুলবে। কিন্তু কতটুকু আলোচনা হবে বলা যায় না। মেনন বলেন, গত সংসদ অধিবেশনে ঋণখেলাপি নিয়ে আলোচনার নোটিশ দেয়া হলেও, আলোচনাই আসেনি। তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন লুটেরাদের হাতে জিম্মি। রাজনীতিকেও ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে। এই অবস্থার অবসানে জনগণের বিভিন্ন অংশকে জেগে উঠতে হবে। সকল গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তিকে এক হতে হবে। ওয়ার্কার্স পার্টি সেই লক্ষ্যে নিজেকে সংগঠিত করছে। সংগঠন-আন্দোলন দিয়েই কেবলমাত্র বর্তমান পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটতে পারে।
তিনি আরো বলেন, ঋণ খেলাপীদের দশ বছরে ব্যাংক তাদের টিকিটি ছুতে পারবে না। বরং তাদের বিরুদ্ধে করা মামলা তুলে নিতে হবে। আর যারা নিয়মিত কিস্তি দেবেন তাদের কপালে জুটবে ব্যাংকের বার্ষিক প্রতিবেদনে ছবি আর এক বছরের সুদের ১০%। সুতরাং এখন থেকে সবাই ঋণখেলাপী হবে, এটাই হবে বাস্তবতা। ব্যাংকিং খাতের নতুন স্লোগান হবে “আমরা সবাই ঋণখেলাপী হব, জনগণের টাকা বিদেশে পাচার করবো।”
এদিকে গত ১৫ মে জাতীয় প্রেসক্লাবের এক অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের সভাপতি ম-লীর সদস্য সাবেক মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ আদালতের বিষয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন।
দেশের প্রশাসন এমনকি আদালতও অর্থের কাছে নত হয়ে পড়ছে দাবি করেছেন ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ পর্যায়ের এই নেতা। তিনি বলেন, “এই দেশে পয়সা দিয়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কেনা যায়, পয়সা দিয়ে আইনজীবী কেনা যায়, এমনকি আদালত পর্যন্ত কেনা যায় পয়সা দিয়ে।”
এ সময় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের হুঁশিয়ার করে নাসিম বলেন, “আজকে আমরা আশ্বস্ত হতাম যদি বিএনপি বিরোধী দল হিসেবে থাকত। ভয় ওখানে, বিএনপি এখন ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। তার জোট ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। মনে রাখতে হবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে চক্রান্ত যখন ব্যর্থ হয়, তখন গভীর ষড়যন্ত্র চলে।”
টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান সম্প্রতি সংবাদ মাধ্যমকে বলেছেন, বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করা। তার ভাষায়, ‘এগুলোকে প্রায় অকার্যকর করার দিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, এটা থেকে ঘুরে দাঁড়ানো অপরিহার্য। কিন্তু এটা বাস্তবে সম্ভব বলে প্রতীয়মান হয় না। ফলে এই অবস্থা থেকে বেরুতে হলে কখন কীভাবে পরিবর্তন আসবে, সেটা  ভেবে আমি উদ্বিগ্ন।’ তিনি ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দল সম্পর্কে মূল্যায়ন করেছেন। বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক দলের চরিত্র অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছে। অনেক ক্ষেত্রে দলটি এখন ক্ষমতার অপব্যবহারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এটা আত্মঘাতী।
অতীতে দুর্নীতি বিষয়ে দেশের প্রধান বিরোধী দল একটা লিপ সার্ভিস দিতো। সেটা এখন হারিয়ে  গেছে। ৫ম সংসদে তৎকালীন পানিসম্পদ মন্ত্রী মাজেদুল হকের  ছোটখাটো দুর্নীতির অভিযোগ বিষয়ে সংসদীয় কমিটি হয়েছিল। দিনের পর দিন বিতর্ক হয়েছে। কয়েক শ’ পৃষ্ঠার সংসদীয় রিপোর্ট ছাপা হয়েছিল। আজ সেসব স্বপ্নের মতো। এরকম একটি অচলাবস্থা ভাঙার জন্য কারাবন্দি খালেদা জিয়ার মুক্তি একটি সম্ভাবনার কথা বলে। তিনি দেশে থাকেন বা বিদেশে যান, অনেকের মতে, রাজনীতিতে একটা দমবন্ধ করা পরিস্থিতির অবসান হওয়া দরকার। তবে তিনি প্যারোলে নাকি জামিনে  বেরুবেন- তা নিয়েই দরকষাকষি চলছে। ইতিমধ্যে তিনি পরিত্যক্ত কারাগারে দীর্ঘ সময় পার করে একটি ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। আইনজ্ঞরা অনেকেই এমন পরিবেশে তাকে এভাবে রাখা কতোটা জেল কোডসম্মত সেটা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। কেউ এ বিষয়ে মন্তব্য করতে দ্বিধান্বিত। কারণ তুলনা করার মতো কোনো উদাহরণ জাতির ইতিহাসে নেই। সর্বশেষ জানা গেছে, তাকে  কেরানীগঞ্জে স্থানান্তর করা হচ্ছে।  সেখানেই ৩৪ মামলায় তার বিচারে এজলাস বসবে।  আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, এতদিনে  কেরানীগঞ্জে নারী কয়েদিদের রাখার জায়গার কাজ শেষ হয়েছে। তাই খালেদা জিয়াকে পুরান ঢাকার নাজিম উদ্দিন রোডের কেন্দ্রীয় কারাগার  থেকে কেরানীগঞ্জে স্থানান্তর করতে অসুবিধা নেই। 
বিএনপি’র অনেকেই অবশ্য মনে করেন, দেশের সার্বিক যা পরিস্থিতি, যেখানে রাজনীতি অনুপস্থিত, গণতন্ত্রের ঘাটতি গভীরতর, সেখানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী কীভাবে কারাগার থেকে বের হবেন, সেই বিষয়ে প্রক্রিয়াগত প্রশ্ন তোলা বৃথা।
বেগম খালেদা জিয়ার দরকার আশু চিকিৎসা। মুক্ত পরিবেশে তার নিজের চিকিৎসক দিয়ে মনমতো চিকিৎসক বাছাই করে স্বাস্থ্যসেবা নেয়া। এখন সেটা তিনি করবেন জামিনে না প্যারোলে, সেটা  একটা কূটতর্ক। অবশ্য দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, বেগম জিয়া প্যারোল না নিতে দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ। তাকে অবশ্য স্মরণ করানো হয়েছে, এক এগারোতে আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা প্রথমে প্যারোল নিতে চাননি। কিন্তু পরে রাজি হন। ওয়াকিবহাল সূত্রগুলো বলেছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সর্বশেষ বৈঠকে বিএনপি আশাবাদী হয়েছিল। সেটা মিলিয়ে যায়নি।
তার মুক্তির প্রশ্ন অমিমাংসিত রেখেই বগুড়া-৬ আসনে বিএনপি নির্বাচনে নামছে। সংরক্ষিত নারী আসনেও নাম পাঠাবে। কিন্তু এতসব সত্ত্বেও রাজনীতির নিকটবর্তী অচলায়তন ভাঙার প্রশ্নটি বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির ওপর নির্ভরশীল। 
‘বাংলাদেশ ঘিরে বিদেশি চক্রান্ত’
আওয়ামী লীগের আলোচিত সাবেক একজন সংসদ সদস্য সম্প্রতি এক নিবন্ধে বাংলাদেশ ঘিরে বিদেশি চক্রান্তের কিছু বিস্ফোরক তথ্য দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণে সিআইএ, আইএসআই ও র’ দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব রেখে আসছে। সাম্প্রতিক নির্বাচনে সেই প্রভাব বা নিয়ন্ত্রণ চীনের হাতে চলে গেছে।
বাংলাদেশের সবক্ষেত্রে চীনের দাপা-দাপিতে এ দেশের সরকারবিরোধীরা চুপচাপ বসে থাকলেও সিআইএ এবং র’ কিন্তু বসে নেই। তারা বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে চীন-রাশিয়া এবং তাদের দোসরদের সব তৎপরতা রুখে দেয়ার জন্য যে মহাপরিকল্পনা নিয়ে এগোবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই এবং তা নিঃসন্দেহে আগামী দিনে আমাদের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সামাজিক সংহতি তছনছ করে দেবে। 
তিনি লিখেছেন, ১৯৭৫ সালের পনেরোই আগস্টের পূর্বাপর ঘটনা নিয়ে বিদেশি সাংবাদিকরা যেসব অনুসন্ধানী বই-পুস্তক রচনা করেছেন তাতে বিদেশী গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর অপতৎপরতা, প্রতিশোধ গ্রহণের নোংরা স্পৃহা এবং মঞ্চের ওপর থেকে পুরনো পুতুলদের সরিয়ে দেয়ার যে কাহিনী জানতে পারা যায়, তা রীতিমতো বিস্ময়কর এবং ভয়াবহও বটে।
তার মতে, বঙ্গবন্ধুর পরে যত সরকারই ক্ষমতায় এসেছে তারা সবাই বিদেশী শক্তিগুলোর সাথে মোটামুটি ভারসাম্য রক্ষা করে ক্ষমতায় টিকে ছিলেন। কিন্তু তাদের মধ্যে কেউ কেউ যখন কোনো কারণে ভারত অথবা মার্কিনিদের রোষানলে পড়েছেন তখনই তাদেরকে বেইজ্জতি করে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছে।
তিনি আরো লিখেছেন, আমাদের দেশের সাম্প্রতিক ইতিহাস যারা জানেন তারা নিশ্চয়ই স্বীকার করবেন, গত দশটি বছর ধরে বাংলাদেশের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক তলানিতে ঠেকেছে। ২০১৮ সালের মাঝামাঝি এসে আওয়ামী লীগ হঠাৎ করে তাদের ভারতমুখী পররাষ্ট্রনীতি ত্যাগ করে চীনের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। চীন দীর্ঘদিন থেকে অনবরত চেষ্টা চালিয়ে আসছিল বাংলাদেশের ওপর তাদের একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তারের। কিন্তু তারা কৌশলগত কারণে সেই সুযোগ পায়নি। কারণ পৃথিবীর অন্যান্য দেশে তারা যেভাবে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে সেই রকম পরিস্থিতি তারা ২০১৮ সালের পূর্বে বাংলাদেশে পায়নি অথবা সৃষ্টি করতে পারেনি। বিষয়টি পরিষ্কার করার জন্য সাম্প্রতিক দুনিয়ায় চীনের আধিপত্য নিয়ে কিছুটা আলোকপাত করা দরকার। চীন সাধারণত দুইভাবে গত তিন দশক ধরে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করে আসছে। তারা সারা দুনিয়াকে দুইটি ভাগে ভাগ করেছে। এক ভাগকে তারা কেবলমাত্র অর্থনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য ব্যবহার করবে আর অন্য অংশকে ব্যবহার করবে অর্থনৈতিক-সামরিক-ভৌগোলিক এবং কৌশলগত রাজনীতির স্বার্থে।
চীন তাদের অর্থনৈতিক আধিপত্য পৃথিবীর সব দেশে ইতিমধ্যে বিস্তার করে ছেড়েছে, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, রাশিয়া, তুরস্ক, জাপান প্রভৃতি প্রতিদ্বন্দ্বী দেশে চীনা অর্থনীতির দাপট এত বেশি যে, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে চীনা প্রভাব এড়ানোর জন্য রীতিমতো যুদ্ধের কথা কল্পনা করতে হচ্ছে। পশ্চিমা দেশগুলো ছাড়াও চীন সাব সাহারার কিছু আফ্রিকান দেশ, আরব অঞ্চলের কয়েকটি দেশ, মধ্য এশিয়ার দেশগুলো এবং দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশকে রীতিমতো নিজেদের অর্থনৈতিক কলোনি বানিয়ে ফেলেছে, যারা চীনের মতের বাইরে এক কদম এগোবার সাহস করে না। চীন এশিয়ার যেসব অঞ্চলকে সামরিক ও অর্থনৈতিক বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ মনে করে সেসব দেশের মধ্যে উত্তর কোরিয়া, পাকিস্তান, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ এবং নেপালকে ইতিমধ্যে কব্জা করে নিয়েছে। কিন্তু তাদের চীর প্রতিদ্বন্দ্বী ভারতকে মোকাবেলা ও নাস্তানাবুদ করার জন্য ওসব দেশের চেয়েও তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো বাংলাদেশ। বাংলাদেশকে নিয়ে মহাচীনের মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা সমস্যা সৃষ্টি করা হয় এবং প্রায় বারো লাখ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করানো হয়। চীন যেসব দেশে সামরিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য বিস্তার করে সেসব অঞ্চলকে রেড জোন আখ্যা দিয়ে সেখানকার সব কিছুর সূচক নিজেদের অনুকূলে আনার চেষ্টা করে। এ ক্ষেত্রে তাদের প্রথম পছন্দ সেনাবাহিনী। তারা পাকিস্তান, মিয়ানমার এবং থাইল্যান্ডের মতো করে সেনাবাহিনীকে নিজেদের কব্জায় নেয়ার চেষ্টা করে রেড জোনগুলোতে ত্রিমাত্রিক তৎপরতা চালাতে থাকে। তাদের দ্বিতীয় পছন্দ হলো- উত্তর কোরিয়ার কিম, মালয়েশিয়ার নাজিব রাজাক, রাশিয়ার পুতিন, ভেনিজুয়েলার প্রয়াত হুগোস্যাভেজ এবং বর্তমানের মাদুরোর মতো কর্তৃত্ববাদী একনায়ক এবং একনায়কের তল্পিবাহক রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠী। তারা রেড জোনগুলোতে তাদের প্রয়োজনীয় নিয়ামকগুলো পেয়ে গেলে সর্বশক্তি নিয়োগ করে অক্টোপাসের মতো সংশ্লিষ্ট দেশ-জাতিকে কব্জা করে নেয়। বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের সাম্প্রতিক সম্পর্ক বিবেচনা করলে এ কথা স্পষ্ট যে, তারা গাঙ্গেয় ব-দ্বীপে তাদের মনের মতো দোসর পেয়ে গেছে। পত্রিকায় খবর বের হয়েছে, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে নজিরবিহীনভাবে একটি এমওইউ স্বাক্ষর হয়েছে। এটি নজিরবিহীন প্রধানত দু’টি কারণে। প্রথমত, দক্ষিণ এশিয়ার কোনো দেশের রাজনৈতিক দলের সাথে এর আগে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি কোনো এমওইউ স্বাক্ষর করেনি। রাষ্ট্রীয়ভাবে চীন এবং বাংলাদেশ ইতোমধ্যে প্রায় পঞ্চাশ বিলিয়ন ডলার অর্থাৎ প্রায় সাড়ে চার লাখ কোটি টাকা সমমূল্যের বাণিজ্যিক প্রটোকল স্বাক্ষর করেছে। চীন তার অন্যান্য রেড জোন ঘিরে যেসব দীর্ঘমেয়াদি সামরিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করে সেসব প্রকল্পের অনেকগুলো ইতোমধ্যে বাংলাদেশে দৃশ্যমান হয়েছে।
আওয়ামী লীগের সাবেক এই সংসদ সদস্য লিখেছেন, চীনের সাথে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক মাখামাখিমূলক সম্পর্ক ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে কতটা বিক্ষুব্ধ করেছে তা সহজেই অনুমেয়। বিগত দিনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে খারাপ সম্পর্ককে মোকাবেলা করা হয়েছে ভারতের সাথে দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট লেনাদেনার মাধ্যমে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ভারতের প্রভাবে বাংলাদেশের অনেক কিছু মেনে নিয়েছিল অথবা মানতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে চীনের কারণে ভারত বাংলাদেশের সাথে পারস্পরিক সম্পর্কের যে নতুন রসায়ন সৃষ্টি হয়েছে তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সুযোগ করে দিয়েছে বাংলাদেশের বিষয়ে তাদের অতীতের রাগ-ক্ষোভ ও বিতৃষ্ণার প্রতিশোধ গ্রহণ করে মনের ঝাল মেটানোর। 
এতোদিন বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সম্ভাবনায় ভাগ বসানোর জন্য পশ্চিমা দেশগুলো বাংলাদেশের ব্যাপারে নমনীয় হতে বাধ্য হয়। ফলে ২০১৪ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে আওয়ামী লীগ সরকার পশ্চিমা দেশগুলো এবং তাদের এশীয় মিত্র যথা জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সৌদি আরব, দুবাই, কাতার প্রভৃতি দেশের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করার সুযোগ পেয়ে যায়। রাশিয়াও বিভিন্ন কারণে বাংলাদেশকে উদারভাবে ব্যাকআপ দিতে থাকে। এদিকে, দীর্ঘদিন ওঁৎ পেতে থাকা চীনও আওয়ামী লীগকে লুফে নেয়। তখন সার্বিক বিবেচনায় আওয়ামী লীগের কাছে ভারতের চেয়ে চীনকে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে নির্ভরযোগ্য ও লাভজনক মনে হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ভারতের কর্তৃত্ব ও তাঁবেদারি বহাল রেখে গোপনে চীনের সাথে সমঝোতার ফলে ৩০ ডিসেম্বর আবারো ক্ষমতায় আসা সম্ভব হয় বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।
বাংলাদেশের উল্লিখিত প্রেক্ষাপট এবং বর্তমানের নির্মম বাস্তবতায় ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের কায়েমি স্বার্থ এবং এই অঞ্চলের আধিপত্যের ওপর মারাত্মক হুমকি বিবেচনা করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কখন এবং কিভাবে কী কী ব্যবস্থা নেয়া যায় তা নিয়ে দিল্লি এবং ওয়াশিংটনের পররাষ্ট্র দফতর ও গোয়েন্দা অফিসগুলো রীতিমতো গরম সময় অতিবাহিত করছে। তারা চীনের নতুন এই রেড জোনে কোনো অবস্থাতেই চীনের কর্তৃত্ব স্থায়ী হতে না দেয়ার ব্যাপারে সম্ভাব্য সব ব্যবস্থা গ্রহণে তৎপর হবে বলে রাজনৈতিক ও সামরিক বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করেছেন। ফলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে পুরনো দিনের মতো পুনরায় সিআইএ এবং র’-এর পদচারণা, পদভার এবং অপতৎপরতার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কোন পথে- এই জিজ্ঞাসা নিয়ে সম্প্রতি এক গোলটেবিল বৈঠক আয়োজন করে বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট (বিইআই) ও ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই)। এতে রাজনীতিক, কূটনীতিক, নিরাপত্তা বিশ্লেষক, শিক্ষাবিদ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন। ওই বৈঠকে আলোচনায় উঠে আসে আমাদের পররাষ্ট্রনীতির ভেতর-বাহির, জাতীয় নিরাপত্তা, রোহিঙ্গা সমস্যা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতির নানা দিক।
আলোচনায় প্রায় সব বক্তা অভিমত প্রকাশ করেন, যেকোনো দেশের পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য হলো সর্বোচ্চ জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা। কিন্তু অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঐক্য সুদৃঢ় না হলে সেটি অর্জন করা সম্ভব নয়। আমাদের দুই প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি বিরোধী দলে থাকতে একে অপরের বিরুদ্ধে ‘সার্বভৌমত্ব’ বিকিয়ে দেওয়ার অভিযোগ করে থাকে, যা জাতীয় স্বার্থ রক্ষার পরিপন্থী। বক্তারা বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রভাবশালী দেশগুলোর সঙ্গে সদ্ভাব রেখে ভারসাম্যের কূটনীতি প্রতিষ্ঠা করেছে এবং এর সুফলও পেয়েছে। বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে চীন-ভারত, যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া, চীন-জাপান এবং চীন-যুক্তরাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব আর লুকোছাপার বিষয় নয়। বাংলাদেশ এই পাঁচ প্রভাবশালী দেশের সঙ্গে সংহত অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক এবং ক্ষেত্রবিশেষে কৌশলগত সামরিক সহযোগিতারও সম্পর্ক গড়ে তুলতে পেরেছে। বর্তমানে ভারতের সঙ্গে আমাদের রাজনৈতিক সম্পর্ক গভীর। আবার অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে চীনের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। এই দুই দেশের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে গিয়ে যেন আমরা জাতীয় স্বার্থের বিষয়টি ভুলে না যাই, সে বিষয়ে সতর্ক করে দিয়েছেন কূটনীতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ২০ মে ২০১৯ প্রকাশিত)