শুক্রবার, ২৩-আগস্ট ২০১৯, ০২:৪৫ অপরাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • চকবাজার ট্র্যাজেডি : কার তদন্ত সঠিক-স্বরাষ্ট্র না শিল্প মন্ত্রণালয়ের?

চকবাজার ট্র্যাজেডি : কার তদন্ত সঠিক-স্বরাষ্ট্র না শিল্প মন্ত্রণালয়ের?

shershanews24.com

প্রকাশ : ১৯ মার্চ, ২০১৯ ০৯:৫৩ অপরাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: চকবাজারের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড আর মর্মান্তিক মৃত্যু মিছিলের দায় নিয়ে ঠেলাঠেলি চলছে শুরু থেকেই। কোনো পক্ষই এই নির্মম ট্র্যাজেডির দায় নিতে চাচ্ছে না। এমনকি আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক দু’জন শিল্পমন্ত্রীও এর দায় নিয়ে পরস্পর কাঁদা ছোড়াছুড়ি করছেন। সরকারের আলাদা আলাদা কর্তৃপক্ষ এই ঘটনার ভিন্ন ভিন্ন কারণ দেখিয়েছে। সেটিও নিজেদের দায়-দায়িত্ব এড়িয়ে অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপানোর জন্য। তবে কেউ এই দায় নিতে না চাইলেও দেশের সর্বোচ্চ আদালত থেকে বলা হয়েছে- এটিকে নিছক দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দেয়া যাবে না, এটি অবহেলা। কাউকে না কাউকে এই ঘটনার দায় নিতে হবে। এমনকি সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও বলেছেন, এই ঘটনার দায় সরকার এড়াতে পারে না।  
প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ধনীদের লোভের কারণেই চকবাজার ট্র্যাজেডির মতো ঘটনা ঘটেছে। 
পত্রিকাটির অনুসন্ধানী ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘বাংলাদেশ এশিয়ার দরিদ্র দেশগুলোর একটি। কিন্তু দারিদ্র্য আর ঘনবসতি শুধু নয়, পুরান ঢাকার আবাসিক ভবনে মজুদ করে রাখা অনুমোদনবিহীন রাসায়নিক ও দাহ্য পদার্থই এই বিপুল পরিমাণ প্রাণহানীর জন্য দায়ী। মুনাফার স্বার্থে ধনী ব্যবসায়ীরা কখনও ঘুষ দিয়ে, কখনও আবার গোপনে আইন ভঙ্গ করে প্লাস্টিক তৈরিতে ব্যবহৃত রাসায়নিকের মতো দ্রব্য আবাসিক ভবনে রেখে দেয়। অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, চকবাজারের বাসিন্দারা ধনীদের ওই লোভের আগুনেই পুড়ে মরেছেন।’
ঢাকার একজন প্রকৌশলীর বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে আরো বলা  হয়েছে, ‘এটি দারিদ্রের ব্যাপার নয়, এটি লোভের পরিণতি।’
তিনি বলেন, ‘যে মানুষগুলো আবাসিক ভবনে এই রাসায়নিক ও দাহ্য পদার্থ মজুদ করছেন, তারা সবাই ধনী। তাদের রয়েছে সুন্দর বাড়ি ও গাড়ি। তাদের ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করে বিদেশে।’ 
বিশ্লেষকরা বলছেন, ৯ বছর আগে নিমতলীর ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড থেকে শিক্ষা না নেয়া এবং ওই ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন না করার কারণেই এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। ওই অগ্নিকা- ১২৪ জনের প্রাণ কেড়ে নিয়েছিলো। চকবাজারের আগুনেও অন্তত ৭১ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। তবে এবারও যে শিক্ষা হয়েছে তা নয়। জীবন মৃত্যুর প্রশ্ন হলেও পুরান ঢাকার কেমিক্যাল গোডাউন উচ্ছেদের সাম্প্রতিক অভিযানে বিভিন্নমহল থেকে বাধা দেয়া হচ্ছে আশ্চর্যজনকভাবে। অথচ এ পর্যন্ত যতগুলো কর্তৃপক্ষ তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছে তারা প্রত্যেকেই ভয়াবহ এই অগ্নিকা-ের জন্য আত্মঘাতী কেমিক্যালের মজুদকেই দায়ী করেছে। এই কেমিক্যাল থেকেই যে আগুনের সূত্রপাত হচ্ছে বারবার সেটিও স্পষ্ট করে দিয়েছে। যদিও বর্তমান শিল্পমন্ত্রী এ অগ্নিকাণ্ড কেমিক্যালের কারণে হয়নি বলে দাবি করেছিলেন ঘটনার পরের দিন থেকেই। শিল্পমন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি তড়িঘড়ি করে একটি প্রতিবেদনও দিয়েছিলো মন্ত্রীর এই বক্তব্যের স্বপক্ষে। গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ থেকেই ভয়াবহ এই অগ্নিকা- হয়েছে বলে তারা দাবি করেছিলো। তবে শেষ পর্যন্ত তা ধোপে তো টেকেইনি বরং এই অগ্নিকাণ্ড নিয়ে শিল্পমন্ত্রণালয়ের তড়িঘড়ি প্রতিবেদনের রহস্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিভিন্ন পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সঠিকভাবে অনুসন্ধান না করে কার স্বার্থে শিল্প মন্ত্রণালয় ভিত্তিহীন এই প্রতিবেদন দিয়েছিলে সেটিই এখন খতিয়ে দেখা উচিৎ। কারণ, সর্বশেষ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি বলেছে, গাড়ির গ্যাস সিলিন্ডার নয়, ক্যামিকেলের গোডাউনই আগুনের সূত্রপাত।
২০ ফেব্রুয়ারি রাতে আগুন লাগার পরই সবগুলো চ্যানেল লাইভ সম্প্রচার করেছে। ওই সময় মাঝে মধ্যেই বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া গেছে। আর গণমাধ্যমকর্মীসহ স্থানীয়রাও বলেছেন কেমিক্যালের গোডাউনই আগুনের সূত্রপাত এবং এসব গোডাউনের কারণে আগুন দ্রুত আশপাশে ছড়িয়ে পড়ে। মূলত রাসায়নিক দ্রব্য থাকার কারণেই ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা শত চেষ্টা করেও আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি।
বিস্ফোরক পরিদপ্তরের কর্মকর্তাও বলেছেন- ঘটনাস্থলে অবৈধ কেমিক্যালের মজুদ ছিল। এমনকি আইজিপিও বলেছেন কেমিক্যালের কারণে আগুন বেশি ভয়াবহ হয়েছে।
কিন্তু, সরকারের শিল্পমন্ত্রণালয় এই অগ্নিকাণ্ডের কারণ নিয়ে তড়িঘড়ি একটি প্রতিবেদন দিয়ে বলেছে, আগুনের সঙ্গে কেমিক্যালের কোনো সম্পর্ক নেই। এখানে কেমিক্যালের কোনো গোডাউন ছিল না। শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ হুমায়ুনও দফায় দফায় টেলিভিশনে বলেছেন, ঘটনাস্থলে কোনো কেমিক্যালের গোডাউন ছিল না। 
ভয়াবহ এই অগ্নিকা- ও মর্মান্তিক এই ট্রাজেডির পর শিল্পমন্ত্রণালয়ের তড়িগড়ি তদন্ত প্রতিবেদন ও মন্ত্রীর বক্তব্যে মানুষের মধ্যে নানা প্রশ্ন জন্ম দিয়েছে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এত বড় ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন কীভাবে দিল শিল্প মন্ত্রণালয়? কেমিক্যাল চাপা দিতেই কি শিল্প মন্ত্রণালয়ের এই তড়িঘড়ি তদন্ত প্রতিবেদন?
কারণ, ২০১০ সালে পুরান ঢাকার নিমতলীতে ভয়াবহ আগুনে পুড়ে নিহত হয়েছিল কমপক্ষে ১২৪ জন। ওই আগুনের মূল উৎস ছিল কেমিক্যালের গোডাউন। জানা গেছে, ওই সময় শিল্প মন্ত্রণালয় একটি তদন্ত প্রতিবেদন দেয়ার কথা ছিল। সেই তদন্ত প্রতিবেদন তারা এখনো দেয়নি। কথা ছিল পুরান ঢাকা থেকে সব কেমিক্যালের গোডাউন সরানো হবে। কিন্তু আজ পর্যন্ত এনিয়ে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি।
এখন প্রশ্ন হলো- আজ পর্যন্ত কেমিক্যালের গোডাউনগুলো সরানো হলো না কেন? কি কারণে এগুলো এখনো রাখা হয়েছে? এর পেছনে কাদের স্বার্থ জড়িত?
কি কারণে কেমিক্যালের বিষয়টি চাপা দিতে শিল্পমন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তড়িঘড়ি প্রতিবেদন দিয়ে বলা হয়েছে যে এখানে কোনো কেমিক্যালের গোডাউন ছিল না। এই প্রশ্ন আরো জোরালো হয়েছে ৭ মার্চ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন জমা দেয়ার পর। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে দেয়া ওই প্রতিবেদনে অগ্নিকা-ের জন্য কেমিক্যালকেই দায়ী করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, কোনো সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়নি এবং বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকেও আগুনের সূত্রপাত হয়নি। ওয়াহেদ ম্যানশনের দোতলার কেমিক্যাল গোডাউনে কোনও লিকেজ থেকেই আগুনের শুরু হয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই প্রতিবেদন দেয়ার পর শিল্প মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন যে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং বিশেষ স্বার্থে ছিলো তা একেবারেই স্পষ্ট হয়েছে। 
আগুনের উৎস নিয়ে তদন্ত কমিটিগুলো যা বলছে 
গাড়ির বা রেস্তোরাঁর গ্যাস সিলিন্ডার নয়, ওয়াহেদ ম্যানশনের দোতলা থেকেই যে  বিভীষিকাময় এই অগ্নিকা-ের সূত্রপাত ঘটেছিল একাধিক তদন্তে তা উঠে এসেছে।  
ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশের (আইইবি) তদন্ত প্রতিবেদনে এই আগুন ভয়াবহ হয়ে ওঠার জন্য ওই ভবনটির দ্বিতীয় তলায় থাকা দাহ্য প্রসাধনী ও অন্যান্য সামগ্রীর বিপুল মজুদকে দায়ী করা হয়েছে। ফায়ার সার্ভিস ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটির অনুসন্ধানেও একই তথ্য বেরিয়ে এসেছে। তবে কী থেকে আগুন কীভাবে লেগেছিল, তা নিশ্চিত করতে না পারলেও প্রকৌশলীদের সংগঠন আইইবি’র তদন্তকর্তারা বলছেন, বৈদ্যুতিক সুইচ অন করার সময় স্ফূলিঙ্গ থেকে বা অসাবধানতাবশত জ্বালানো আগুন থেকে এই অগ্নিকা- ঘটে।
গত ২০ ফেব্রুয়ারি পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে যে পাঁচটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, তার মধ্যে সবচেয়ে নাজুক অবস্থা ওয়াহেদ ম্যানশনের। 
ওই ভবনের দোতলার পুরোটা প্লাস্টিক সামগ্রী ও প্রসাধনীর গুদাম ছিল। বেইজমেন্টে ছিল বিপুল পরিমাণ রাসায়নিকের মজুদ। অগ্নিকা-ের ঘটনায় যে ৭১ জনের মৃত্যু হয়েছে, তাদের মধ্যে ২৪টি মৃতদেহ পাওয়া যায় ওয়াহেদ ম্যানশনের নিচতলার সিঁড়ি ঘরে।
চুড়িহাট্টার আগুনের সূত্রপাতের জন্য প্রথমে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের কথা বলা হলেও সে রকম কোনো আলামত তদন্তকারীরা সেখানে পাননি। অথচ তাৎক্ষণিকভাবে ১৪ ঘণ্টার চেষ্টায় চুড়িহাট্টার আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার পর শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ হুমায়ুন আগুনের সূত্রপাতের জন্য গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণকে দায়ী করেছিলেন; ওই এলাকার ব্যবসায়ীরাও একই রব তুলেছিল। বিদ্যুতের ট্রান্সফর্মার বিস্ফোরণের কথাও বলছিলেন কেউ কেউ।  কিন্তু বিভিন্ন সংস্থার তদন্তকারীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে গ্যাস সিলিন্ডার কিংবা ট্রান্সফর্মার বিস্ফোরণের কোনো আলামত না পাওয়ার কথা জানিয়ে ওয়াহেদ ম্যানশনের দাহ্য পদার্থের গুদামের দিকেই ইঙ্গিত করেছিলেন।
৫ মার্চ এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে আইইবির তদন্ত দল সরাসরি ওয়াহেদ ম্যানশনের দাহ্য পদার্থের গুদামকেই অগ্নিকাণ্ডের উৎসস্থল হিসেবে চিহ্নিত করে।
আইইবির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার মনজুর মোর্শেদ সংবাদমাধ্যমকে বলেন, এই আগুনের সূত্রপাত রাসায়নিক থেকেই। “আমরা শতভাগ নিশ্চিত এটা কেমিক্যাল থেকে সৃষ্টি হয়েছে, অন্য কিছু না। অন্য কিছু হলে নিচে থেকে আগুন আসত। নিচে ট্রান্সফরমার বিস্ফোরণ বা সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হয়নি। সবকিছুই ঠিক ছিল।”
ওয়াহেদ ম্যানশনের দোতলা থেকেই আগুনের সূত্রপাতের বিষয়টি নিশ্চিত হলেন কীভাবে- এ প্রশ্নে আইইবির তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক মো. নুরুল হুদা বলেন, তারা পরিদর্শনের সময় কয়েকটি বিষয় মাথায় রেখেছিলেন, কিন্তু ওয়াহেদ ম্যানশনের দোতলা থেকেই বিস্ফোরণের পক্ষে প্রমাণ পেয়েছেন।
“তিনটা দিক থেকেই পরীক্ষা করেছি। বাইরে কোথাও একটা বিস্ফোরণ হলে এটা ওয়ালে ধাক্কা খেলে ওয়ালটা ভেতরের দিকে যাবে। কিন্তু এটা ভেতরের দিকে যায়নি। বাইরের দিকে গেছে। যখন একটা রুমের ভেতরে বিস্ফোরণ হয় তখন ওয়াল ভাঙলে বাইরের দিকে যায়।
“ওইখানে আমরা দেখেছি ওই রুমের থেকে জিনিসগুলো বাইরের দিকে গেছে। এটা দেখে আমাদের মনে হয়েছে এটা ভেতরের থেকে হয়েছে। বাইরে থেকে নয়।”
অগ্নিকাণ্ডের দুদিন পর ২৩ ফেব্রুয়ারি এই তদন্ত কমিটি গঠন করে আইইবি। কমিটি প্রতিবেদন তৈরি করে ২ মার্চ তা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে হস্তান্তর করে বলে আইইবির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার মনজুর মোর্শেদ জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, “আমরা রিপোর্ট তৈরি করে তা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে জমা দিয়েছি। সেখানে আমরা বিভিন্ন সুপারিশমালা দিয়েছি। আমাদের কী পর্যবেক্ষণ ছিল, ঘটনাস্থলের বর্ণনা, অগ্নিকাণ্ডের কী কারণ, এসব কিছুই বলা হয়েছে প্রতিবেদনে।”
“সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন বা আমলে নিলে এ ধরনের ঘটনা আর ঘটবে না বলে আমি মনে করি।”
এই অগ্নিকা-ের ঘটনায় সরকারিভাবে পাঁচটি তদন্ত কমিটি হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়, ফায়ার সার্ভিস এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন আলাদাভাবে তদন্ত কমিটি গঠন করে।
আইইবি’র প্রতিবেদনে কী আছে?
আইইবি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অগ্নিকাণ্ডের সিসিটিভি ফুটেজ ও মোবাইল ক্যামেরার কিছু ভিডিওতে আগুন ছড়িয়ে পড়তে দেখে অনেকেই দাবি করেছে, আগুন ওয়াহেদ ম্যানশনের বাইরে থেকে শুরু হয়ে ভবনে ছড়িয়েছে। কিন্তু মসজিদের পাশের সিসিটিভির ফুটেজে দেখা গেছে, বিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গে এয়ার ফ্রেশনারের ক্যান রাস্তার উপর এসে পড়ছে। তাতে আপাত দৃষ্টিতে আগুন ওয়াহেদ ম্যানশনের দ্বিতীয় তলা থেকে শুরু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এছাড়া বিপুল পরিমাণে অতি দাহ্য পদার্থ থাকায় আগুন লাগার পর বিস্ফোরণের দেয়াল ভেঙে পড়েছে এবং অভ্যন্তরীণ দেয়ালের পলেস্তরা খসে পড়েছে। তবে ভেতরের দিকে অক্সিজেনের সরবরাহ কম থাকায় আগুন সেদিকে বাড়তে পারেনি। এজন্য ওয়াহেদ ম্যানশন সংলগ্ন ওয়াহেদ মঞ্জিলের কোনো ক্ষতি হয়নি। তার বদলে আগুন রাস্তার দিকে ছড়িয়ে পড়ে।
বিপরীতমুখী নানা তথ্য থাকায় ঘটনাস্থলের পরিপূর্ণ ফরেনসিক তদন্ত প্রয়োজন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে আইইবি।
কী মিলল পর্যবেক্ষণে
তদন্ত কমিটি তাদের পর্যবেক্ষণে বলেছে, ওয়াহেদ ম্যানশনের আশপাশের এলাকা পরিদর্শনের সময় দেখা গেছে, সেখানে ডিপিডিসির বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার ছিল না। বিদ্যুৎ বিতরণ লাইনেও শর্ট সার্কিটের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। ট্রান্সফরমার যেখানে ছিল, সেখানে তা অক্ষত অবস্থায় রয়েছে। বিদ্যুৎ বিতরণ লাইনও অক্ষত ছিল।
সরেজমিন পরিদর্শনের বরাত দিয়ে কমিটি বলেছে, প্লাস্টিক দানা নেওয়ার জন্য যে পিকআপ ভ্যানটি ওয়াহেদ ম্যানশনের নিচে দাঁড়িয়ে ছিল, তা ডিজেলচালিত। অথচ একটি পিকআপ/মাইক্রোবাসের গ্যাস সিলিন্ডারের বিস্ফোরণে আগুন ছড়িয়ে পড়েছে বলে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। ওয়াহেদ ম্যানশনের দ্বিতীয় তলায় বিভিন্ন ধরনের প্রসাধনী সামগ্রী ভস্মীভূত ও প্রায় অক্ষত অবশিষ্টাংশ দেখা যায়। এরমধ্যে যেসব সামগ্রীর লেবেল অক্ষত অবস্থায় পাওয়া গেছে সেগুলো হচ্ছে, বাদামের তেল, রেড়ীর তেল, অলিভওয়েল, এয়ার ফ্রেশনার ও সুগন্ধী। এছাড়া আরও কিছু প্রসাধনীও অক্ষত ছিল।
ওয়াহেদ ম্যানশনের দ্বিতীয় তলায় প্রসাধনী সামগ্রী মজুদ ছাড়াও খালি ক্যানে পারফিউম, এয়ার ফ্রেশনার রিফিল করা হত। এগুলো উদ্বায়ী ও দাহ্য পদার্থ। পারফিউমের অন্যতম উপাদান ইথানলের ফ্ল্যাশ পয়েন্ট ১৬.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এয়ার ফ্রেশনারের ক্যানে প্রোপিল্যান্ট হিসেবে এলপিজি ব্যবহৃত হয়। বাতাসে এয়ার ফ্রেশনারের ঘনত্ব আনুমানিক শতকরা একভাগ হলেই তা দাহ্যতার নিম্নসীমা অতিক্রম করে এবং স্ফূলিঙ্গের উপস্থিতিতে আগুন ধরে বিস্ফোরণ হতে পারে। এলপিজি সাধারণত নিচু ও বন্ধ জায়গায় জমা হয়। জমাটবাধা এলপিজি অনেকদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে এবং স্ফুলিঙ্গের সংস্পর্শে আসামাত্র ফ্ল্যাশ ব্যাকের মাধ্যমে বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে।
‘চুড়িহাট্টা অগ্নিকা- দুর্ঘটনা নয়, অবহেলা’
চকবাজারের অগ্নিকা-কে নিছক কোনো দুর্ঘটনা বলা যাবে না, এটা অবহেলা। কাউকে না কাউকে এর দায় নিতেই হবে। ২৫ ফেব্রুয়ারি কয়েকটি রিট আবেদনের শুনানি নিয়ে এই পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট।
চুড়িহাট্টা অগ্নিকা-ে ক্ষতিপূরণ প্রদান, পুরান ঢাকা থেকে কেমিক্যালের গুদাম অপসারণসহ কয়েক দফা নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে দায়ের হওয়া তিনটি রিট আবেদনের শুনানিকালে আদালত এ কথা বলেন।
আদালতের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ উদ্ধৃত করে রিট মামলার বাদিপক্ষের আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, “নিমতলির ঘটনার পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কমিটি যে সুপারিশ করেছিল, তা বাস্তবায়ন হলে চকবাজারে এ দুর্ঘটনা ঘটত না।”
শুনানিকালে আদালত বলেন, “ওইসব এলাকার বাড়ির মালিকেরা তিনগুণ বেশিতে গোডাউন ভাড়া দেন। আর নিজেরা থাকেন গুলশানে। মারা যায় গরিব মানুষ। সিটি করপোরেশন দেখেও না দেখার ভান করে।”
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ১১মার্চ ২০১৯ প্রকাশিত)