সোমবার, ২৬-আগস্ট ২০১৯, ১১:৩১ পূর্বাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • প্রশ্নফাঁস রোধে চরমভাবে ব্যর্থ শিক্ষামন্ত্রণালয়

প্রশ্নফাঁস রোধে চরমভাবে ব্যর্থ শিক্ষামন্ত্রণালয়

shershanews24.com

প্রকাশ : ১৯ অক্টোবর, ২০১৭ ০৪:৩৬ অপরাহ্ন

শীর্ষ কাগজের সৌজন্যে:বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এখন ভয়ানক ব্যাধির নাম প্রশ্নফাঁস। কোনো ভাবেই প্রশ্নফাঁস বন্ধ করতে পারছে না শিক্ষা মন্ত্রণালয়। বলা যায়, প্রশ্নফাঁস বন্ধে নানা তদারকি করেও ব্যর্থ হয়েছে শিক্ষামন্ত্রণালয়। এবারের এসএসসি পরীক্ষায় গণিতের প্রশ্নফাঁসের কথা শিক্ষামন্ত্রণালয় প্রথমে অস্বীকার করলেও পরে এর প্রমাণ মিলেছে। পরীক্ষা শুরুর ২৪ ঘণ্টা আগেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রশ্ন পেয়ে গেছে অনেক পরীক্ষার্থী। যদিও শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ সংবাদ সম্মেলন করে বলেছিলেন, প্রশ্ন ফাঁসের কোনো সুযোগ নেই। তবে পরীক্ষা শুরুর অনেক আগেই ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ম্যাসেঞ্জারসহ নানান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফাঁস হয়ে যায় প্রশ্ন। অনেকে রাতেই ফেসবুকে পোস্ট করেছেন প্রশ্নপত্রের মূল কপি। কেউ কেউ আবার এসব প্রশ্নের কপি বিভিন্ন গণমাধ্যমেও মেইল করে পাঠিয়েছেন। পরীক্ষার পর দেখা গেছে ফাঁস হওয়া প্রশ্নের সঙ্গে হুবহু মিলে গেছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের প্রশ্ন। পরবর্তীতে প্রমাণ পাওয়া গেছে কিছু অসাধু শিক্ষকই এর সঙ্গে জড়িত।
প্রশ্নফাঁসে জড়িয়ে পড়ছেন শিক্ষকরা
প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো গর্হিত কাজের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন কিছু সংখ্যক অসাধু শিক্ষক। ইতিমধ্যে প্রশ্নপত্র ফাঁসের মামলায় রাজধানীর কমলাপুর শেরেবাংলা স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ আবদুল আলিমকে গ্রেফতারের পর কারাগারে পাঠানো হয়েছে। চার দিন রিমান্ড নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আদালতে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা বলেছেন, এই আসামি ধূর্ত প্রকৃতির। তিনি আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি দিতে ইচ্ছুক নন। এরআগে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে ১ মার্চ কমলাপুর শেরেবাংলা স্কুল অ্যান্ড কলেজের ইংরেজির শিক্ষক রফিকুল ইসলামসহ আটজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে প্রশ্নপত্র ফাঁসের দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেন শিক্ষক রফিকুল ইসলাম। এঁদের জবানবন্দির ওপর ভিত্তি করেই অধ্যক্ষ আবদুল আলিম ৭ মার্চ গ্রেপ্তার হন।
কোচিং সেন্টারের আড়ালে প্রশ্নফাঁসের ব্যবসা
এসএসসি পরীক্ষায় গণিতের প্রশ্নপত্র পরীক্ষার দিন সকালেই ছড়িয়ে পড়ে। তখন ঢাকা বোর্ডের পক্ষ থেকে সন্দেহ প্রকাশ করা হয় যে পরীক্ষা শুরুর আগেভাগে শিক্ষকের মাধ্যমে প্রশ্নপত্র ফাঁস হতে পারে। এখন দেখা যাচ্ছে, আগেভাগে নয়, পরীক্ষাকেন্দ্র থেকেই প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। জ্ঞানকোষ একাডেমি নামের একটি কোচিং সেন্টারের আড়ালে মূলত প্রশ্নপত্র ফাঁসের ব্যবসা চলে। গত ১ মার্চ গ্রেফতার হওয়া জ্ঞানকোষ একাডেমি নামের কোচিং সেন্টারটির শিক্ষক জহিরুল ইসলাম জবানবন্দিতে প্রশ্নপত্র ফাঁসের কথা স্বীকারও করেছেন। এছাড়া রাজধানীর মতিঝিল এলাকার চারটি স্কুলের ৭ শিক্ষকসহ মোট ১৯ ব্যক্তির বিরুদ্ধে মাধ্যমিক পরীক্ষার (এসএসসি) প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ পাওয়া গেছে; যাঁদের মধ্যে ৯ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন। আদালতে দেওয়া আসামিদের জবানবন্দি থেকে জানা যায়, ওই কোচিং সেন্টারের মালিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস করে তা অসাধু শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতেন মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে। পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগ মুহূর্তে ক্যামেরায় প্রশ্নপত্রের ছবি তুলে নিয়ে অসাধু শিক্ষকদের সহায়তায় দ্রুত উত্তর লিখিয়ে নেওয়া হতো। এর সঙ্গে কোচিং সেন্টারটির মালিক ও শিক্ষকরা সরাসরি জড়িত।
শিক্ষামন্ত্রীর অসহায়ত্ব প্রকাশ!
প্রশ্নফাঁস নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ অনেক হুমকি-ধামকি দিয়ে এসেছেন। এদিকে প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ তিনি বরাবর অস্বীকারও করেছেন। অনেক সময় তিনি সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমগুলোর ওপর দোষ চাপিয়ে নিজের দায় এড়ানোর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু এবার প্রশ্নপত্র ফাঁসের একাধিক প্রমাণ মিলে যাওয়ার পর তিনি এখন নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করছেন। সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আয়োজিত অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেছেন, আমরা এমন একটি পরিবেশের মধ্যে আছি, যা আমরা সব খুলে বলতেও পারি না, সহ্যও করতে পারি না। তার এই বক্তব্যের পর অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, মন্ত্রী যদি সব কথা খুলে বলতে না পারেন, তাহলে সাধারণ মানুষের অবস্থা কী হবে?
প্রশ্নফাঁস বন্ধ চায় সবাই
সবার দাবি এখন একটাই প্রশ্নফাঁস বন্ধ। শিক্ষাবিদরা বলছেন, যে কোনো মূল্যে পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ করতে হবে। ফাঁস হওয়া প্রশ্নে পরীক্ষা দিয়ে জিপিএ পাঁচ পাওয়া এই ‘মেধাবীরা’ই জাতির মেরুদন্ডে আঘাত করবে একদিন। প্রশ্নপত্র ফাঁসের দায়ে একটি চক্রের কয়েকজন মাত্র ধরা পড়েছেন। এ ধরনের চক্র আরও আছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব তাদের খুঁজে বের করে বিচারের কাঠগড়ায় সোপর্দ করা। আর এর সঙ্গে জড়িত অভিভাবকদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. কায়কোবাদ গণমাধ্যমকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে কয়েকটি ধাপ পেরিয়ে প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও ছাপা হয়। ৫০ থেকে ৬০ জন মানুষের হাত ঘুরে যে প্রশ্নপত্র ছাপা হবে, সেখানে তা ফাঁস হবে না, সেটিই বরং অসম্ভব ব্যাপার। তিনি বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় আগে এ বিষয়টি অস্বীকার করে গেছে, কিন্তু এখন তারাও মনে করছে কিছু একটা হয়েছে। এ জন্য নতুন চিন্তা করছে। প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে নতুন পদ্ধতি এখনই শুরু করা উচিত বলে মত দেন ওই তথ্যপ্রযুক্তিবিদ। মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের পরিচালক মুহাম্মাদ আল-আমীন গণমাধ্যমকে বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের বহু জায়গা থাকে। তবে যে-ই করুক, পুলিশ তা তদন্ত করে দেখতে পারে।
(সাপ্তাহিক শীর্ষ কাগজে ২০১৭ সালের  ২০ মার্চ প্রকাশিত)