বুধবার, ২১-আগস্ট ২০১৯, ০৫:৩৮ পূর্বাহ্ন

টান টান উত্তেজনা, বিচার বিভাগ বিপর্যস্ত

shershanews24.com

প্রকাশ : ১৯ অক্টোবর, ২০১৭ ০৪:১৯ অপরাহ্ন

শীর্ষ কাগজের সৌজন্যে: প্রধান বিচারপতির অস্বাভাবিক ছুটিকে কেন্দ্র করে গত প্রায় দুই সপ্তা ধরে এক ধরনের টান টান উত্তেজনা বিরাজ করছিল গোটা দেশে। আলোচনা-সমালোচনা, তর্ক-বিতর্ক, নানা রকমের গুজবও একের পর এক ছড়িয়ে পড়ছিল। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে মানুষ দিন কাটাচ্ছিল। বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশিরাও গভীর উৎকণ্ঠার মধ্যে ছিল। ক্ষণে ক্ষণে দেশে ফোন করে জানতে চাচ্ছিল- কী হচ্ছে, কী হতে যাচ্ছে? গত ১৩ অক্টোবর প্রধান বিচারপতি বিদেশ গমনের মধ্য দিয়ে মনে করা হচ্ছিল, এ পরিস্থিতির অবসান হবে। তা আর অবসান হচ্ছে না। এখনকার সময়টাকে সাময়িক সময়ের জন্য কিছুটা বিরতি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। শিগগিরই আবার একই ইস্যু চাঙ্গা হবে। কারণ, প্রধান বিচারপতি এখনো তার পদে আছেন। তিনি ইতিমধ্যেই বলে গেছেন, অসুস্থ নন, সম্পূর্ণ সুস্থ। তবে সরকারের আচরণে বিব্রত। একেবারে চলে যাচ্ছেন না, আবার আসবেন- এমন কথাও দৃঢ়তার সঙ্গে বলে গেছেন। তার স্ত্রী ঢাকায়ই রয়ে গেছেন। যে কারণে সার্বিক পরিস্থিতিকে স্বস্তিদায়ক বলে মনে করা হচ্ছে না। যদিও কথিত ১১টি দুর্নীতির অভিযোগ এনে এস কে সিনহাকে মোখিকভাবে কর্মচ্যূত রাখার কথা ঘোষণা করেছেন আইনমন্ত্রী। কিন্তু আদৌ এটি সম্ভব কিনা তা বোঝা যাবে আর কয়েক দিন পরেই, তিনি দেশে ফিরে এলে। তাছাড়া এসব অভিযোগের বিষয় নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়াও রয়েছে। প্রমাণ হওয়া ছাড়াই শুধু অভিযোগের প্রেক্ষিতে একজন প্রধান বিচারপতিকে তার পদ থেকে সরিয়ে যায় কিনা, এ নিয়ে প্রশ্ন রাখছেন সংবিধান বিশেষজ্ঞরা? তাই তিনি দেশে ফিরে আসলে অবশ্যই চেয়ারে বসার উদ্যোগ নেবেন এবং নভেম্বরের প্রথম সপ্তায় দেশে ফিরবেন বলে মনে করা হচ্ছে।
সুপ্রিম কোর্টে যা ঘটলো
গত ২ অক্টোবর প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা হঠাৎ এক মাসের ছুটির আবেদন করেন। পরদিন ৩ অক্টোবর ছিল সুপ্রিম কোর্টের অবকাশ পরবর্তী খোলার দিন। অতীতের রেওয়াজ অনুযায়ী খোলার দিন সিনিয়র আইনজীবী ও বিচারকদের মিলনমেলা হওয়ার কথা। সেই প্রস্তুতিই চলছিল। প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা মিলনমেলার প্রস্তুতি নিতেই মূলত ২ অক্টোবর সকালে অফিসে আসেন। আর সেখান থেকে তার এক মাসের ছুটিতে যাওয়ার খবর প্রচারিত হয়। বিষয়টি সবাইকে অবাক করে দেয়। বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা একে জোরপূর্বক ছুটি বলে আখ্যায়িত করতে থাকেন। অন্যদিকে আইনমন্ত্রী, এটর্নি জেনারেলসহ আওয়ামী লীগ নেতারা জোর দিয়ে বলেছেন, প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা ক্যান্সার আক্রান্ত। ক্যানসারের চিকিৎসা করাতেই এই দীর্ঘ ছুটি তিনি নিজে চেয়ে নিয়েছেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, এস কে সিনহাকে যদি জোরপূর্বক ছুটিতে পাঠানো হতো তাহলে তো তিনি জনসম্মুখে একথা বলে দিতেন।
কিন্তু, ১৩ অক্টোবর বিমান বন্দরে যাবার আগে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা লিখিত এবং মৌখিকভাবে বলে গেছেন, তিনি অসুস্থ নন, সম্পূর্ণ সুস্থ আছেন। আর এ ঘটনাকে বিএনপি নেতা ও আইনজীবীরা লুফে নেন। তারা বলতে থাকেন, আমরা যে বলেছি, জোর করে প্রধান বিচারপতিকে ছুটিতে পাঠানো হয়েছে সেটিই এখন প্রমাণিত হলো। এতে সরকার চরমভাবে বিব্রত হয়। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক বলেন, প্রধান বিচারপতির এমন বিবৃতি দেশকে অস্থিতিশীল করে তুলবে। এস কে সিনহার বিবৃতিতে এও বলা হয়েছিল যে, বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি রুটিন ওয়ার্ক করবেন। এর বাইরে তিনি অন্য কোনও দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ বলেছেন, বিবৃতিটি প্রধান বিচারপতির কিনা খতিয়ে দেখতে হবে। কিন্তু, প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা নিজ হাতেই যে সাংবাদিকদের কাছে এ বিবৃতিটি প্রচার করছেন এটা টেলিভিশনের লাইভেও দেখা গেলো। ফলে বিবৃতি যে সঠিক এতে আর কারও কোন সন্দেহ থাকলো না। সরকারের তরফ থেকে এ বিবৃতিকে কাউন্টার দেয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েন নীতিনির্ধারকরা। অবশেষে সরকারের তৎপরতায় ১৪ অক্টোবর শনিবার সুপ্রিম কোর্ট থেকে রেজিস্ট্রার জেনারেলের স্বাক্ষরে একটি বিবৃতি জারি হয়। তাতে বলা হয়, রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহাকে ব্যতিরেকে আপিল বিভাগের অন্য বিচারপতিদের নিয়ে বসেছিলেন। প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার বিরুদ্ধে ১১টি দুর্নীতির অভিযোগ রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ অন্য বিচারপতিদের হাতে দেন। এর ফলে আপিল বিভাগের অন্য ৫ জন বিচারপতি নিজেরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা প্রধান বিচারপতির সঙ্গে বিচারালয়ে বসতে রাজি নন। বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি আবদুল ওয়াহহাব মিয়াকে প্রধান বিচারপতির অনুরূপ দায়িত্ব দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি। কাজেই তিনি সব রকমের দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। সুপ্রিম কোর্টের পক্ষ থেকে এমন নজিবিহীন বিবৃতি সবাইকে অবাক করে দেয়। এরপর ১৫ অক্টোবর রোববার ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি আবদুল ওয়াহহাব মিয়া রেজিস্ট্রার জেনারেল, রেজিস্ট্রার, প্রধান বিচারপতির পিএসসহ এস কে সিনহার ঘনিষ্ঠ ১০ জন কর্মকর্তাকে শাস্তিমূলক বদলি করেন। রেজিস্ট্রার জেনারেলসহ মাত্র দু’জনকে ঢাকায় দেয়া হয়, তাও কম গুরুত্বপূর্ণ পদে। বাকি ৮ জনকেই ঢাকার বাইরে বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে পদায়ন করা হয়। এসব বদলি বা পদায়ন সরকারের ইচ্ছায়ই হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। কারণ, এর আগে আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি আবদুল ওয়াহহাব মিয়ার সঙ্গে সাক্ষাত করে এসে বলেছেন, সুপ্রিম কোর্টের প্রশাসনে পরিবর্তন হবে।     
সিনহা গৃহবন্দী ছিলেন কী
গত ২ অক্টোবর থেকে সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশনসহ বিএনপিপন্থি আইনজীবী এবং বিএনপি নেতারা এই মর্মে দাবি করে আসছিলেন যে, প্রধান বিচারপতিকে গৃহবন্দী করে রাখা হয়েছে। অন্যদিকে, এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমসহ সরকারি মহল থেকে বলা হচ্ছিল প্রধান বিচারপতি গৃহবন্দী নন। এমন বিতর্কের মধ্যেই আইনমন্ত্রী এডভোকেট আনিসুল হক ৫ অক্টোবর বিকেলে প্রধান বিচারপতির হেয়ার রোডের বাসায় যান। তিনি সেখান থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, প্রধান বিচারপতি অসুস্থ, তাই তাকে দেখতে গিয়েছি। আনিসুল হক বের হয়ে যাবার পর পরই এস কে সিনহা ঢাকেশ্বরী মন্দিরে পুজা দিতে যান। সেখানে হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃষ্টান ঐক্য পরিষদ নেতা রানা দাস গুপ্ত ও এডভোকেট সুব্রত চৌধুরীর সঙ্গে এস কে সিনহার সাক্ষাত এবং কথাও হয়। রানা দাস গুপ্ত পরে সাংবাদিকদের বলেন, প্রধান বিচারপতিকে অসুস্থ মনে হয়নি। তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ আছেন। এরপর এক পর্যায়ে ডা. সজল ব্যানার্জিসহ হার্টের একাধিক ডাক্তার এস কে সিনহাকে বাসায় গিয়ে পরীক্ষা করে দেখেন। বাংলাদেশের একমাত্র স্বাস্থ বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা আইসিডিডিআরবি-তে এস কে সিনহা নিজে গিয়ে স্বাস্থ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করান। এছাড়া তিনি দাঁতের ডাক্তারের কাছেও যান। এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে, তিনি বেশ ক’বার বাসা থেকে বের হয়েছেন। কিন্তু সমস্যা হলো, কোথাও তিনি কারও কাছে কোনরকমের মন্তব্য করেননি। ফলে তার অবস্থা সম্পর্কে বিতর্ক থেকেই গিয়েছিল। অবশেষে তিনি বিদেশ যাবার প্রাক্কালে প্রকাশ্য বিবৃতির মাধ্যমে এটম বোমা ফাটিয়ে যান।
৯৭ ধারার প্রয়োগ
প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা বিদেশ যাবার প্রাক্কালে যে বিবৃতি প্রচার করেন তাতে বলা হয়, ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি শুধুমাত্র রুটিন দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। এতে এটা বোঝানো হয় যে, সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনে কোনও কিছু পরিবর্তন আনার ক্ষমতা তার নেই।
অন্যদিকে গত ১৪ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টের পক্ষ থেকে প্রচারিত বিবৃতিতে বলা হয়, প্রধান বিচারপতির অনুরূপ দায়িত্ব পালন করবেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি। রাষ্ট্রপতি তাকে সেই দায়িত্ব দিয়েছেন সংবিধানের ৯৭ ধারার বলে। কিন্তু, সংবিধানের ৯৭ ধারা কী বলে? এতে বলা হয়েছে,
“৯৭। প্রধান বিচারপতির পদ শূন্য হইলে কিংবা অনুপস্থিতি, অসুস্থতা বা অন্য কোন কারণে প্রধান বিচারপতি তাঁহার দায়িত্বপালনে অসমর্থ বলিয়া রাষ্ট্রপতির নিকট সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হইলে ক্ষেত্রমত অন্য কোন ব্যক্তি অনুরূপ পদে যোগদান না করা পর্যন্ত কিংবা প্রধান বিচারপতি স্বীয় কার্যভার পুনরায় গ্রহণ না করা পর্যন্ত আপীল বিভাগের অন্যান্য বিচারকের মধ্যে যিনি কর্মে প্রবীণতম, তিনি অনুরূপ কার্যভার পালন করিবেন।”
রাষ্ট্রপতি যে প্রক্রিয়ায় এক্ষেত্রে সংবিধানের ৯৭ ধারার প্রয়োগ করলেন তা সঠিক হয়েছে কিনা এ নিয়ে বিতর্ক চলছিল। তারই মধ্যে রেজিস্ট্রার জেনারেলসহ সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের ১০ জন কর্মকর্তাকে বদলি করলেন অনুরূপ দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি।
১১ অভিযোগ বিতর্ক
সুপ্রিম কোর্টের পক্ষ থেকে প্রচারিত বিবৃতিতে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অর্থপাচার সম্পর্কিত ১১টি অভিযোগের তথ্য তুলে ধরা হয়। এতে আরও বলা হয়, আপিল বিভাগের বাকি ৫ জন বিচারপতি প্রধান বিচারপতির সঙ্গে বিচারালয়ে বসতে রাজি নন। সুপ্রিম কোর্টের বিবৃতির এ অংশটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ সর্বত্র ব্যাপক বিতর্ক দেখা দেয়। অধিকাংশই এই মর্মে বলতে থাকেন যে, প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে যদি এতোগুলো অভিযোগ থাকেই তাহলে কেন তদন্তের ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। অভিযোগগুলো তো বেশ পুরনো। বেশিরভাগই এস কে সিনহা হাইকোর্ট বিভাগে থাকাকালের। এমন অভিযোগ থাকার পরও কেন তাকে আপিল বিভাগে তোলা হলো? কেনই বা তাকে প্রধান বিচারপতি পদে আসীন করা হলো। তাছাড়া কেন তদন্তের ব্যবস্থা না করে সংবাদ মাধ্যমে এগুলো প্রচার করা হলো?
দুদক তদন্ত করতে পারে কি?
আইনমন্ত্রী এডভোকেট আনিসুল হক সংবাদ মাধ্যমকে বলেছেন, প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে যে ১১টি অভিযোগ তোলা হয়েছে সে ব্যাপারে তদন্ত করবে দুর্নীতি দমন কমিশন বা দুদক। এখন প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি তো নয়ই, আদৌ অন্য কোনও বিচারপতির বিরুদ্ধে পদে বহাল থাকাকালে দুর্নীতি দমন কমিশন কোনও অভিযোগের তদন্ত করতে পারে কিনা?
সুপ্রিম কোর্টের কোনও বিচারপতির বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত বা ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষমতা একমাত্র ছিল সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে এই ক্ষমতা জাতীয় সংসদকে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু, পরবর্তীতে ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ের মাধ্যমে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল আবার ক্ষমতা ফিরে পেয়েছে। বর্তমান বিধান অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের বিরুদ্ধে আনা যে কোনও অভিযোগের তদন্ত ও ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা একমাত্র সুপ্রিম জুড়িশিয়াল কাউন্সিলেরই আছে। সেক্ষেত্রে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলকে বাদ দিয়ে বিচারপতিদের বিরুদ্ধে দুদক তদন্ত ও ব্যবস্থা গ্রহণের নজির সৃষ্টি হলে সেটি গোটা বিচার বিভাগে অস্থিরতা সৃষ্টি করবে বলে সংশ্লিষ্ট মহল আশংকা প্রকাশ করছেন।  
রাষ্ট্রপতি বিচারপতিদের নিয়ে মিটিং- সংবিধান লঙ্ঘন?
সুপ্রিম কোর্টের নজিরবিহীন ওই বিবৃতিতে বলা হয়েছে যে, রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ গত ৩০ সেপ্টেম্বর প্রধান বিচারপতি ব্যতিরেকে আপিল বিভাগের অন্য বিচারপতিদেরকে নিয়ে বসেছিলেন। তিনি ওই বৈঠকে এস কে সিনহার বিরুদ্ধে ১১টি অভিযোগের বিবরণী উপস্থিত বিচারপতিদের কাছে হস্তান্তর করেন।
প্রধান বিচারপতির অনুপস্থিতিতে তার বিরুদ্ধে বৈঠক আয়োজন আসলে রাষ্ট্রপতি করতে পারেন কিনা, এমন প্রশ্ন তুলছেন অনেকে। কেউ কেউ একে ‘সংবিধান লঙ্ঘন’ বলেও আখ্যায়িত করছেন। বিএনপির পক্ষ থেকে সরাসরি এ ব্যাপারে অভিযোগ তুলে বলা হয়েছে যে, রাষ্ট্রপতি সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন। রাষ্ট্রপতি বা তার দফতর থেকে এ নিয়ে কোনও প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত।
চেয়ারে বসতে পারবেন কী
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা নভেম্বরের প্রথম সপ্তায় দেশে ফিরতে পারেন। এবং তিনি তার চেয়ারে বসার উদ্যোগ নেবেন। এস কে সিনহার ১৩ অক্টোবরের বিবৃতি বা খোলা চিঠি সেই ইঙ্গিতই বহন করে। অন্যদিকে এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম এবং আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, প্রধান বিচারপতির চেয়ার ফিরে পাওয়া সুদূর পরাহত। অর্থাৎ তাকে আর চেয়ারে বসতে দেয়া হবে না। ফলে প্রধান বিচারপতি দেশে ফিরলে এবং তার চেয়ারে বসতে চাইলে নতুন এক ধরনের উত্তেজনার সৃষ্টি হবে। সেই পরিস্থিতিতে কে জয়ী হবেন তা এ মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না।
তবে এস কে সিনহাকে তার চেয়ারে বসতে না দিতে সরকার বদ্ধপরিকর বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানাচ্ছে। কিন্তু কীভাবে বা কোন পদ্ধতিতে তার চেয়ারে বসার কাজটি আটকাবে সেটি এখনও পরিষ্কার নয়। শুধুমাত্র দুর্নীতি সংক্রান্ত কিছু অভিযোগের কারণে তাকে দায়িত্ব পালনের অসমর্থ বলে প্রতীয়মান হওয়ার সুযোগ আছে কী, যেসব অভিযোগ এখন পর্যন্ত প্রমাণিত হয়নি, এমনকি তদন্তই শুরু হয়নি?
শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেয়া যায় কী?
সরকারের প্রণীত এখন পর্যন্ত যে আইন চালু আছে তাতে একজন বিচারপতি তো নয়ই, এমনকি কোনও সরকারি অফিসের একজন সাধারণ পিওনের বিরুদ্ধেও তদন্ত ছাড়া শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে কোনও ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ নেই। বর্তমানে বিদ্যমান সরকারি আইন অনুযায়ী যে কোনও কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি বা অন্য কোনও অভিযোগ উত্থাপিত হলে বিভাগীয় মামলা দায়ের করার আগে প্রাথমিক তদন্ত করার নিয়ম রয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়। বিভাগীয় মামলায় চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হলে শাস্তি দেয়ার পদক্ষেপ নেয়া যায়। দুদকের তদন্তের ক্ষেত্রেও প্রায় একই নিয়ম। অথচ, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির পদটি সাংবিধানিক। এ পদের কাউকে শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে শাস্তি দেয়া সম্ভব কী, এমন প্রশ্ন করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিপর্যস্ত বিচার বিভাগ
গত কয়েকদিন ধরে দেশের সর্বোচ্চ বিচারালয় ‘সুপ্রিম কোর্ট’ কেন্দ্রীক ঘটনাবলী সারাদেশের মানুষের মধ্যে আলোচনার শীর্ষে পৌঁছে গেছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, এসব ঘটনাবলী দেশের বিচার বিভাগকেও বিপর্যস্ত করে তুলেছে। বিচার বিভাগের ভাবমুর্তি ক্ষুণœ হচ্ছে, বিচারালয়ের পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে এবং সার্বিকভাবে আইনের শাসন ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। সরকার এবং বিচার বিভাগের মধ্যকার এরকমের টানাপোড়েন চলতে থাকলে ক্ষতির মাত্রা আরও বহুগুণে বাড়বে, যা পূরণ হবার মতো নয়।
(সাপ্তাহিক শীর্ষ কাগজে ২০১৭ সালের ১৬ অক্টোবর প্রকাশিত)