সোমবার, ১৯-আগস্ট ২০১৯, ০৩:৪৭ অপরাহ্ন
  • শিক্ষা
  • »
  • এস এম হলের হামলাকারীরা ছাত্রলীগের, ভিডিও ফুটেজে চিহ্নিত!

এস এম হলের হামলাকারীরা ছাত্রলীগের, ভিডিও ফুটেজে চিহ্নিত!

shershanews24.com

প্রকাশ : ০৮ এপ্রিল, ২০১৯ ০৯:০১ পূর্বাহ্ন

শীর্ষকাগজ, ঢাকা: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে হল সংসদে প্রার্থী হওয়ায় উর্দু বিভাগের স্নাতকোত্তর শ্রেণির শিক্ষার্থী ফরিদ আহমেদকে নির্যাতন করেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এ ঘটনায় হল প্রাধ্যক্ষের কাছে বিচার চাইতে গেলে অবরুদ্ধ করা হয় ডাকসুর ভিপি নুরুল হক নুরসহ অন্যদের। হামলা করা হয় ছাত্র ফেডারেশনের ঢাবি শাখার সভাপতি উম্মে হাবিবা বেনজির, শামসুন্নাহার হলের ভিপি তাসনিম আফরোজ ইমিসহ বেশ কয়েকজনের ওপর। প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযুক্তদের বিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে গঠন করা হয় একটি তদন্ত কমিটি।
গত মঙ্গলবার (২ এপ্রিল) বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম (এসএম) হলে এ ঘটনাটি ঘটে। ঘটনার কয়েকটি ভিডিও ফুটেজে চিহ্নিত করা হয়েছে অভিযুক্তদের পরিচয়। এ ঘটনায় জড়িতদের অনেকেই ছাত্রলীগের সক্রিয় নেতাকর্মী বলে জানা গেছে। তাদের মধ্যে কয়েকজন আছেন যাদের গত বছরে বিভিন্ন অপকর্মের দায়ে ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল।
যদিও ছাত্রলীগ আগে থেকেই দাবি করেছে, তারা এ ঘটনায় জড়িত নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন এর আগে বলেছেন, হামলার নাটক সাজিয়ে তাদের চরিত্রে দাগ লাগানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে ভুক্তভোগীরা ঘটনার সময় ধারণ করা বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজ দেখে হামলাকারীদের শনাক্ত করেছেন। তারা নিশ্চিত হয়েছেন হামলাকারীদের পরিচয় সম্পর্কে।
হামলায় জড়িতরা
এ ঘটনার কয়েকদিন পর কয়েকটি ভিডিও ফুটেজ দেখে হামলাকারীদের শনাক্ত করেছেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সেদিন ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা এক শিক্ষার্থী ভিডিও ফুটেজ দেখিয়ে বলেন, ঢাবি শাখা ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি উম্মে হাবিবা বেনজিরের শরীরে যে ছেলেটি দৌড়ে এসে লাথি মারেন তিনি লোক প্রশাসন বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ও এস এম হল শাখা ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী মোবাশ্বের মারুফ। তিনি ছাত্রলীগ মনোনীত হল সংসদের জিএস জুলিয়াস সিজারের সমর্থক।
অভিযোগের বিষয়ে মোবাশ্বের মারুফ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমি ঘটনার দিন দুপুরে ট্রেনে করে কক্সবাজার আসি। এসেই হোটেলে উঠি। আমি এর সঙ্গে জড়িত নই।’ তবে কক্সবাজারে কোনো ট্রেন লাইনই নেই। এ সংক্রান্ত একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। 
ট্রেনে যেতে চাইলে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত গিয়ে তারপর বাসে করে কক্সবাজার যেতে হবে। মোবাশ্বেরের কাছে চট্টগ্রাম পর্যন্ত ট্রেনের টিকেট দেখতে চাইলে দেখাতে পারেননি। তবে তিনি কক্সবাজারের যে হোটেলে ওঠেন তার একটি রশিদ দেখান। সেখানে দেখা যায়, ঘটনার পরের দিন ৩ এপ্রিল তিনি ওই হোটেলের একটি কক্ষ ভাড়া নেন। এ ছাড়া তিনি কক্সবাজার থেকে ঢাকায় ফেরার একটি বাসের টিকিট দেখালেও তাতে কোনো নাম বা সময় উল্লেখ নেই।
হামলার ঘটনার ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, যারা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করেছিল তাদের মধ্যে রয়েছেন এস এম হল শাখা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি আরিফুল ইসলাম আরিফ, সহসাধারণ সম্পাদক নওশের আহমেদ, সহসভাপতি মিলন হোসাইন নিরব, সাংগঠনিক সম্পাদক সানাউল্লাহ সায়েম, উপ-ক্রীড়া সম্পাদক জাহিদ হাসান, নাট্য ও বিতর্ক বিষয়ক সম্পাদক আতিকুর রহমান আতিক, কর্মসূচি ও পরিকল্পনা সম্পাদক নাবিল হায়দার এবং হল ছাত্র সংসদের ১ নম্বর সদস্য আবির রহমান সৈকত।
ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেন, হামলাকারীদের নেতৃত্বে ছিলেন হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি তাহসান আহমেদ রাসেল, সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান তাপস, হল সংসদের ভিপি ও ছাত্রলীগ নেতা মুজাহিদ কামাল এবং জিএস জুলিয়াস সিজার তালুকদার।
এদিকে ছাত্রলীগের বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, সংগঠনের শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে হল শাখা ছাত্রলীগের সহসভাপতি ও হল সংসদের ভিপি মুজাহিদ কামালকে এর আগে ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়। সংগঠনটির গত কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইন বহিষ্কারের বিষয়টি সেই সময় সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেন। একাধিক গণমাধ্যমেও বহিষ্কারের বিষয়টি আসে।
অন্যদিকে অভিযুক্ত কামালের বিরুদ্ধে বুয়েট মার্কেটের একটি হোটেলে খাওয়া শেষে টাকা না দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সে সময় তাঁর নেতৃত্বে ওই হোটেলে ভাঙচুর করা হয়। এতে একটি মামলাও করে হোটেল কর্তৃপক্ষ। এই মামলায় দুই নম্বর আসামি হন ২ এপ্রিলের হামলায় অভিযুক্ত ও হল শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক সানাউল্লাহ সায়েম। সায়েমকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দুই বছরের জন্য বহিষ্কার করা হয়।
ফরিদকে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের মারধরের ঘটনার অভিযোগ দিতে ২ এপ্রিল এস এম হলে যান ডাকসুর ভিপি নুরুল হক নুর ও সমাজসেবা সম্পাদক আকতার হোসেন, শামসুন্নাহার হলের ভিপি শেখ তাসনীম আফরোজ ইমি, কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের সংগঠন বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক মুহাম্মদ রাশেদ খাঁন ও ফারুক হোসেন, ছাত্র ফেডারেশনের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি উম্মে হাবিবা বেনজির, ডাকসুর ভিপি প্রার্থী অরণি সেমন্তি খানসহ কয়েকজন। সে সময় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তাদের বাধা দেয় এবং অবরুদ্ধ করে রাখে। এ সময় হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি তাহসান আহমেদ রাসেল, সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান তাপস, হল সংসদের ভিপি ছাত্রলীগ নেতা কামাল হোসেন, জিএস জুলিয়াস সিজার তালুকদার, সাহিত্য সম্পাদক আকিব মোহাম্মদ ফুয়াদসহ অন্যদের হাতে লাঞ্ছিত হন সেমন্তি, ইমি ও বেনজিরসহ ছাত্রীরা। তাদের গায়ে ডিমও ছুঁড়ে মারে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।
এ ঘটনার পরই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন হামলার শিকার শিক্ষার্থীরা। উপাচার্য অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামানের সাক্ষাৎ না পাওয়ায় তারা সারারাত সেখানে অবস্থান করেন। পরের দিন বুধবার সকালে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামান। তিনি হামলাকারীদের বিচারের আওতায় আনা হবে বলে প্রতিশ্রুতি দেন। পরে সোমবারের মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়ার আলটিমেটাম দিয়ে আন্দোলন স্থগিতের ঘোষণা দেন আন্দোলনকারীরা।
হামলার সময় দর্শকের ভূমিকায় প্রক্টর দল
ভিপি নুরসহ অন্য শিক্ষার্থীদের ওপর যখন হামলা করা হয়েছিল তখন আশপাশে কাউকে দাঁড়াতে দেখা যায়নি। একটি পক্ষ ছিল হামলাকারী আর অন্যটি ছিল ভুক্তভোগী। তখন তৃতীয় একটি পক্ষকে নীরব ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়। তাদের গায়ে প্রক্টর টিমের পোশাক দেখা যায়। কিন্তু তারা ছিলেন দর্শকের ভূমিকায়। হামলাকারীদের কোনো বাধা দেননি তাঁরা।
ঘটনার সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. এ কে এম গোলাম রাব্বানীকে গণমাধ্যমকে বলেন, সেখানে প্রক্টর টিমকে পাঠানো হয়েছে, তারা দেখবে। প্রক্টর দলের নীরব ভূমিকার কথা তাঁকে জানানো হলে তিনি বলেন, ওটা হলের অভ্যন্তরীণ বিষয় তো। হল প্রাধ্যক্ষ যাচ্ছেন, তিনি দেখবেন।
ডিম নিক্ষেপের শিকার হন হল প্রাধ্যক্ষও
ডাকসুর ভিপি নুরুল হক নুরসহ অন্যদের দুই ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখার পর ঘটনাস্থলে যান হল প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মাহবুবুল আলম জোয়ারদার। প্রাধ্যক্ষ ভুক্তভোগীদের উদ্ধার করে বাইরে নিয়ে আসছিলেন, তখনও তাদের ওপর ডিম নিক্ষেপ করা হয়। এই হামলায় বাদ যাননি হল প্রাধ্যক্ষও। যেটি তিনি নিজেই স্বীকার করেছিলেন।
জানতে চাইলে প্রাধ্যক্ষ বলেন, যখন নুরসহ অন্যদের বের করে আনি তখন ধাক্কাধাক্কি হয়েছিল। এই ধাক্কা আমিও খেয়েছিলাম। আমার গায়েও ডিম নিক্ষেপ করা হয়েছিল। অন্ধকারে কারা নিক্ষেপ করেছিল, জানি না। তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা তদন্ত করে দেখবে।
তদন্তে অগ্রগতি নেই
হামলার ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করেন এস এম হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মাহবুবুল আলম জোয়ারদার। এ কমিটির প্রধান করা হয় হলের জ্যেষ্ঠ আবাসিক শিক্ষক ড. সাব্বির আহমেদকে। তদন্তের চারদিন পার হলেও কোনো অগ্রগতি হয়নি বলে জানা যায়।
অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমরা ছুটির কারণে কোনো মিটিং বা কিছুই করতে পারিনি। তদন্ত শেষ করতে প্রায় ৪০ জনের মতো সাক্ষাৎকার নিতে হবে। এতে প্রায় এক মাসের মতো সময় লাগতে পারে।
ব্যবস্থা না নিলে আন্দোলন
ওই হামলায় দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আগামীকাল সোমবার পর্যন্ত আলটিমেটাম দেন আন্দোলনকারীরা। এ সময়ের মধ্যে যদি ব্যবস্থা না নেওয়া হয় তবে কর্মসূচি চালিয়ে যাবেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।
জানতে চাইলে ডাকসুর ভিপি নুরুল হক নুর গণমাধ্যমকে বলেন, ‘উপাচার্য আমাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে তারা বিচার করবেন। আমরা সোমবার পর্যন্ত আলটিমেটাম দিয়েছি। তারা যদি এর মধ্যে বিচার না করে তবে আমরা কর্মসূচি চালিয়ে যাব।’
নুর বলেন, তদন্ত কমিটি চাইলে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দোষীদের খুঁজে বের করতে পারে। এই সময়ই যথেষ্ঠ। আমাদের কাছে সব তথ্য আছে। তারা চাইলে আমরা দিতে পারব।
শীর্ষকাগজ/এম