মঙ্গলবার, ২০-আগস্ট ২০১৯, ১১:৩২ পূর্বাহ্ন
  • জেলা সংবাদ
  • »
  • ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে জেলে, ভিক্ষুক-প্রতিবন্ধীসহ আহত ২৫

ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে জেলে, ভিক্ষুক-প্রতিবন্ধীসহ আহত ২৫

shershanews24.com

প্রকাশ : ২২ জুলাই, ২০১৯ ০৯:২২ পূর্বাহ্ন

শীর্ষনিউজ ডেস্ক: থামছে না ছেলেধরা গুজবে মারধর ও গণপিটুনির ঘটনা। গত দুই দিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছেলেধরা গুজবে পিটিয়ে ২৫ জনকে আহত করেছে।
লালমনিরহাট: আদিতমারী উপজেলায় ছেলেধরা সন্দেহে দুই মানসিক প্রতিবন্ধীকে স্থানীয়রা আটক করে। একজনকে গণপিটুনির পর পুলিশ তাদের হেফাজতে নিয়েছে। অন্যজনকে প্রাথমিক যাচাই বাছাই করে ছেড়ে দেন স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান।
পুলিশ ও স্থানীয়রা জানায়, রোববার সকালে আদিতমারীর সাপ্টীবাড়ী বাজারে ৩৫ বছরের এক মানসিক প্রতিবন্ধীকে বস্তা হাতে ঘুরতে দেখে ছেলেধরা সন্দেহে পিটুনি দেয় স্থানীয়রা।
খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে তাকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে বলে জানিয়েছেন আদিতমারী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সাইফুল ইসলাম।
একই উপজেলার পলাশী ইউনিয়নে ২৫ বছর বয়সী এক নারীকে সন্দেহ করে স্থানীয়রা আটক করেছিল। পরে চৌকিদার দেলোয়ার ওই নারীকে আটক করে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছে নিয়ে যান।
এদিকে লালমনিরহাট শহরের কলাবাগান কলোনিতে ছেলে ধরা সন্দেহে মানসিক প্রতিবন্ধী এক নারীকে (৫২) শনিবার রাতে গণপিটুনি দেওয়া হয়। তাকে বাঁচাতে গিয়ে জিল্লুর রহমান নামে পুলিশের এক এসআই আহত হন বলে লালমনিরহাট সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) এরশাদুল আলম জানিয়েছেন।
ওই নারীকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে লালমনিরহাট সদর হাসপাতালে ভর্তি করেছে পুলিশ।
লালমনিরহাট পুলিশ সুপার এস এম রশিদুল হক গুজবে বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “সন্দেহ হলেই কেউ অপরাধী নয়। মাথা কাটা বা ছেলেধরা এটা একটি গুজব মাত্র।”
কুমিল্লা: সদর উপজেলার আমড়াতলী ইউনিয়নের ধুতিয়া দিঘীর পাড় ও পাশের মাঝিগাছা এলাকায় রোববার সকালে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে নারীসহ চারজন আহত হয়েছেন।
আহতদের তিনজন জেলার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার দুলালপুর ইউনিয়নের বেজোড়া গ্রামের বাসিন্দা। তারা হলেন রত্না বেগম (৪৫), তার স্বামী আবদুস সালাম (৬৫) এবং আরেক যুবক আনোয়ার হোসেন (২৮)।
আমড়াতলী ইউপি চেয়ারম্যান মো. মোজাম্মেল হোসেন বলেন, সকালে ওই তিনজন আমড়াতলী স্কুলের সামনে আসেন। তারা পাশের একটি বাড়ির সামনে গিয়ে পঞ্চম শ্রেণির এক শিশুকে ডাক দিয়ে রত্না বেগমকে বাথরুমে নিয়ে যেতে বলেন। তখন ছেলেধরা সন্দেহে তাদের আটক করে স্থানীয়রা। পরে পুলিশ এসে আহত অবস্থায় তাদেরকে উদ্ধার করে নিয়ে যায়।
কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ছত্রখিল পুলিশ ফাঁড়ির এসআই তপন কুমার বাগচী জানান, ওই তিনজনকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
এদিকে রোববার দুপুর ২টায় কুমিল্লা সদর উপজেলার মাঝিগাছা এলাকায় ছেলেধরা সন্দেহে আরিফ হোসেন (২৮) নামে এক যুবক গণপিটুনির শিকার হন বলে পুলিশ জানায়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া কসবা উপজেলার কোনাকাটা স্বর্ণকার বাড়ি আবদুল রেনু সরকারের ছেলে আরিফ।
হবিগঞ্জ: অলিপুরে রোববার রাতে ছেলে ধরা সন্দেহে তিনজনকে গণপিটুনির পর আহত অবস্থায় হবিগঞ্জ সদর আধুনিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
আহতরা হলেন মাধবপুর উপজেলার নোয়াপাড়া কাশিপুর গ্রামের তোরাব আলীর ছেলে মোখলেছ মিয়া (৩২), একই এলাকার রতনপুর গ্রামের আব্দুর রহিমের ছেলে গিয়াস উদ্দিন (৩২) ও বরিশাল জেলার উজিরপুর থানার হাতিপুর গ্রামের শাহেদ মোল্লার ছেলে সিরাজুল ইসলাম (৩০)।
শায়েস্তাগঞ্জ থানার (ওসি) আনিছুজ্জামান জানান, অলিপুর এলাকায় ওই তিনজন একটি অটোরিকশা নিয়ে ঘোরাফেরা করছিলেন। ছেলেধরা সন্দেহে স্থানীয়রা তাদেরকে ধাওয়া করলে তারা পালানোর চেষ্টা চালালেও ব্যর্থ হন।
হবিগঞ্জ হাসপাতালে ভর্তির পাশাপাশি তাদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে বলে জানান ওসি।
হাসপাতালের চিকিৎসক হায়দার আলী জানান, তিনজনের মধ্যে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনে সিলেটে পাঠানো হতে পারে।
মৌলভীবাজার: সদর, শ্রীমঙ্গল ও কুলাউড়া উপজেলায় রোববার ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনির শিকার হয়েছেন এক রিকশাচালক, এক অটোরিকশাচালক ও একজন দিনমজুর । 
মৌলভীবাজার মডেল থানার ওসি মো. আলমঙ্গীর হোসেন জানান, বিকালে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনির শিকার হন চন্দন পাল (৩০) নামে এক রিকশাচালক। তিনি শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভূনবীর ইউনিয়নের কালিপদ পালের ছেলে।
রাত ৯টার দিকে কুলাউড়া উপজেলায় বসন্ত শব্দকর (২২) নামে এক যুবককে আটক করে এলাকাবাসী মারধর করার পর তাকে উদ্বার করে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ।
কুলাউড়া থানার এসআই কানাই চক্রবর্তী বলেন, কমলগঞ্জের নরেন্দ্রপুরে বসন্ত একজন দিনমজুর। তিনি তার আত্মীয়ের বাড়িতে যাওয়ার পথে গণপিটুনির শিকার হন।
শ্রীমঙ্গল  থানার ওসি মো. আব্দুস ছালেক জানান, রাত ৮টার দিকে কালিঘাট ইউনিয়নের কাকিয়াছড়া এলাকায় দুই ইয়াবা বিক্রেতাকে আটক করে র‌্যাব। তখন এর চালক চা বাগান দিয়ে পালানোর সময় শ্রমিকরা তাকে আটক করে পিটুনি দেয়। খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে তাকে থানায় নিয়ে আসে।
পাবনা: পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় রোববার বিকালে ছেলে ধরা সন্দেহে পিটুনির শিকার দুজনকে জনতার হাত থেকে উদ্ধার করেছে পুলিশ।  তারা হলেন জহুরুল ইসলাম (৩০) ও জিয়া উদ্দিন (৩৫)।
এছাড়া সদর উপজেলার ভাড়ারা ইউনিয়নের দড়িভাউডাঙ্গা গ্রামে সোনিয়া খাতুন (২২) নামে এক নারীকে উদ্ধার করেছে পুলিশ।  তিনি চাঁপাই নবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার উজিরপুর গ্রামের মঞ্জুর হোসেনের মেয়ে সোনিয়া ভিক্ষা করতেন।
পাবনা সদর থানার ওসি ওবাইদুল হক বলেন, “এরা তিনজনেই কেউই ছেলেধরা নয়। জহুরুল ও জিয়া উদ্দিন মানসিক ভারসাম্যহীন ও ভবঘুরে। তাদের ভাষা পরিষ্কার বোঝা যায় না। তারা রোহিঙ্গা বলে মনে করা হচ্ছে। আর সোনিয়া ভিক্ষুক।।”
গুজবে কান না দিয়ে কাউকে সন্দেহ হলে পুলিশে খবর দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন পাবনার পুলিশ সুপার শেখ রফিকুল ইসলাম।
রাজশাহী: নগরীর বিনোদপুর মিজানের মোড় এলাকায় ছেলেধরা সন্দেহে তিনজনকে পিটুনি দেওয়ার পর জানা গেছে তারা একটি চিপসের প্রচারে গিয়েছিলেন।
রোববার দুপুরে এ ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে তাদের উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে বলে জানিয়েছেন মতিহার থানার ওসি হাফিজুল রহামন।
তারা হলেন, দেওয়ান বাছার (৪৫), ইউসুফ আলী (৩৮) ও শামীম রেজা (১৯)। তারা তিনজন রাজশাহী এগ্রো ফুডস অ্যান্ড বেভারেজ কোম্পানির কর্মকর্তা-কর্মচারী।
ওসি বলেন, “এই তিন ব্যক্তি কোম্পানির প্রচারের জন্য শিশুদের চিপস খাওয়াচ্ছিল। এ সময় স্থানীয় লোকজনের মধ্যে সন্দেহ জাগে। এলাকাবাসী পরিচয়পত্র দেখতে চাইলে তারা দেখাতে পারেনি। তখন ছেলেধরা সন্দেহে তাদের পিটুনি দেয় এলাকাবাসী। তাদের প্রাইভেটকারও ভাংচুর করে।”
ওই তিনজনকে থানায় নেওয়ার পর সেখানে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে তাদের ৫০ হাজার টাকা জমিমানা করা হয়।
ওসি বলেন, “ভোক্তা অধিকার আইন অনুযায়ী বিএসটিআইর অনুমোদন ছাড়া চিপস তৈরির অপরাধে তাদের জরিমানা করা হয়েছে।”
নওগাঁ: মান্দা উপজেলার কুসম্বা ইউনিয়নের বুড়িদহ এলাকায় রোববার সকালে ছেলে ধরা সন্দেহে ৬ জেলেকে গণপিুটনি দিয়ে পুলিশে দিয়েছে স্থানীয়রা।
মান্দা থানার ওসি মোজাফ্ফর হোসেন বলেন, “পুকুরে ছোট মাছ ধরার জন্য পুকুর মালিক সনজিত ৬ জেলেকে মাছ ধরতে বলেন। মাছ ধরার সময় জেলেরা তিনটি বড় মাছ গোপনে জালের মধ্যে লুকিয়ে রাখেন। পুকুর মালিক বিষয়টি বুঝতে পারেন।
“তিনি বস্তা দেখতে চাইলে জেলেরা দেখাতে রাজি হচ্ছিল না। এক সময় তারা দৌড় দিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন। এতেই ঘটে বিপত্তি। পাড়ার লোকজন ছেলেধরা সন্দেহে চিৎকার দিয়ে তাদের ধরে গণপিটুনি দেয়। পরে পুলিশ গিয়ে তাদের উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে।”
ওসি বলেন, “তারা প্রকৃতপক্ষে জেলে। ভুল বোঝাবুঝি হওয়ায় এলাকাবাসী তাদের ছেলেধরা সন্দেহে পিটুনি দেয়।।”
শীর্ষনিউজ/প্রতিনিধি/জে